
স্মৃতির জানালা : এক
জানি না কতো দূরের অতীত মনে রাখা যায়। কারণ নিজের অতীত খুঁজতে গিয়ে এটা বুঝেছি। হামাগুড়ি দিয়ে চলার দু’একটি কথা যেমন এক ঝলক করে মনে করতে পেরেছি, পাশাপাশি এখন থেকে ১০ বছর আগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও মনে করতে পারি না। কতো দূরের অতীত দেখতে পাই, আর কতো কাছের অতীত দেখতে পাইনা- এসব নিয়ে তাই বেশ বিব্রত হতে হয়। তারপরেও অতীত তো অতীতই, মনে পড়ুক না পড়ুক, সেটা ছিল- এটাই সত্যি কথা। এরকম গোলকধাঁধায়ই অতীত স্মৃতির কথায় হাত দিতে হলো।
বিধিবদ্ধ জন্ম তারিখ ৯ নভেম্বর ১৯৬২। তার মানে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ছিল ৭ এবং ৮। অর্থাৎ ৯ নভেম্বরের আগে পর্যন্ত ছিল ৭ বছর, আর ৯ নভেম্বরের পর থেকে ছিল ৮ বছর। দুটোই ১৯৭১ সময়কালের বয়স। এই মাইল ফলক ধরেই শুরু করা যাক স্মৃতির জানালা খুলে দেখা।
জন্ম দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লায়। এটা মজুমদার পাড়া বলে পরিচিত। তখন ছিল রায়টের সময়। অর্থাৎ, ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর থেকে একটানা চলছিল ধর্মীয় সম্প্রদায়গতভাবে হিন্দু-মুসলমানের বসতিকে এপার-ওপার করার পালা। এপার মানে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে, অত্যাচার-নির্যাতন করে হিন্দু বাসিন্দাদের ভারতে চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছিল। একইভাবে ওপার বা ভারত থেকেও মুসলমানরা এদেশে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছিলেন। ওপার থেকে আসাদের বিহারী বলা হতো।
আমাদের এলাকাটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। বসতি একেবারেই হাতে গোনা। ঘন জঙ্গলে ভর্তি জায়গায় বেশ দূরে দূরে এক-একটি বাসিন্দার কাঁচা বা মাটির তৈরি ঘরবাড়ি। এই জনপদে মানুষের পাশাপাশি জঙ্গলে বাস করতো মেছো বাঘ, সাজারু-শেয়াল থেকে শুরু করে বহু জাতের বন্য পশু। এসব নিয়েই গরিব বাসিন্দারা অনেকটা বন্য পরিবেশে বাস করতেন। এখানেই শেষ কথা নয়। এ পরিবেশও তছনছ করে দেয় দেশবিভাগ। রায়ট এবং দমন-পীড়নের মুখে হিন্দুরা ভয়ে-আতঙ্কে এখান থেকে বসতি ছাড়ছিলেন। অল্প পয়সায় বাড়ি-ঘর, জমি-জমা বিক্রি করে তারা অনেকটা পালিয়ে যাওয়ার মত ভারতে চলে যাচ্ছিলেন। আমার জানা মতে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমার বাবা মাত্র চার আনা পয়সায় এক হিন্দু মহিলার কাছ থেকে দুটি কাঁচা ঘরসহ জঙ্গলে ভর্তি ২২ শতাংশ জায়গা কিনেছিলেন। এটাই আমার পৈত্রিক বাড়ি এবং এখানেই আমার জন্ম।
জ্ঞান হবার বয়স পর্যন্ত কোন কথা মনে পড়ে না বললেই চলে। তবে পরবর্তী সময়ে বাবা-মায়ের মুখ থেকে শুনে এবং নানাভাবে জেনে কিছু স্মৃতি তৈরি হয়। যেমন, শুনেছি আমাকে নাকি ঘরে বারান্দায় বসিয়ে রেখে মা একদিন সাংসারিক কাজ করছিলেন। আমি তখন হামাগুড়ি দেওয়া অবস্থায় বসতে পারি। বারন্দার মাটির উপর মা আমাকে বসিয়ে রেখেছিলেন। হঠাৎ মা দেখতে পান, একটা গোখরা সাপ বিরাট ফনা তুলে আমার সামনে। আর আমি সাপের দিকে তাকিয়ে খলখল করে হাসছি। সাপ ছোবল মারছিল না, কিন্তু আমার হাসির সঙ্গে দুলে দুলে মজা করছিল। আমি নাকি হাত বাড়িয়ে সাপের লেজ ধরে টানাটানি করছিলাম। তাতেকরে সাপ মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল, আবার উঠে ফনা তুলছিল। এসব দেখে মা আর্তনাদ করতে থাকেন। তখন আশপাশের কেউ কেউ ছুটে আসেন। ততোক্ষণে সাপটি পালিয়ে যায়।
মনে পড়ে আমরা যে মাটির ঘরে থাকতাম, সেটার ভেতরে ডালপালা দিয়ে বানানো একটা খাট (মাঞ্চা) ছিল। বারান্দায় একদিক যাতায়াতের পথ রেখে মাটি দিয়ে একটা নিচু দেওয়াল করা ছিল। তার এক কোনায় মাটির চুলায় রান্নার কাজ করতেন মা।
আমাদের এই পরিবারকে দেখতে মাঝে মধ্যে গ্রাম থেকে আসতেন নানা। তিনি আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। হাত ধরে আস্তে হাঁটিয়ে দূরের পুকুরে নিয়ে যেতেন। এও মনে পড়ে, বিকেল বেলার দিকে বাবা আমাকে কোলে নিয়ে দূরে ইছামতি নদীর দিকে যেতেন। তখন ওই নদী ছিল শুকনো। সেখান দিয়ে আমার মাকে সাহায্য করা এক বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে ওপারে নিজের বাড়িতে যেতেন। এইটুকুই। আর কিছু মনে পড়ে না।
[চলবে]



0 মন্তব্যসমূহ