সময়টা ছিল একাত্তর পূর্ববর্তী। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ হতে পারে। তখন পাবনা শহরে বিদ্যুতের কোন ব্যবস্থা ছিল না। রাতে মানুষ কেরোসিন তেলের হ্যারিকেন অথবা মাটির কুপিবাতি ব্যবহার করতেন। ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে অফিস-আদালতে পর্যন্ত এর ব্যবহার হতো। শহরের সড়ক পথগুলোতেও কেরোসিন বাতির ব্যবস্থা ছিল। রাস্তার ধারে বেশ দূরে দূরে ছিল মানুষ সমান উঁচু ল্যাম্প পোস্ট। তার মাথায় ছিল কাঁচের বাক্সের মধ্যে বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা। মিউনিসিপ্যালিটির কর্মীরা বাইসাইকেলে এসে সন্ধ্যে বেলা ওই বাক্সের মুখ খুলে পরিমাণমত কেরোসিন তেল দিয়ে যেতেন। ম্যাচ জ্বালিয়ে সলতেয় আগুন দিতেন। এই বাতি সারারাত ধরে মিটমিট করে জ্বলতো। ভোরের দিকে তেল ফুরিয়ে গেলে আপনা-আপনি বাতি নিভে যেতো। শহরের বেশিরভাগ রাস্তাঘাটে এভাবেই সরকারিভাবে আলোর ব্যবস্থা করা ছিল। তবে ঝড়-বৃষ্টির সময় এসব বাতি কাজ দিতো না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিভে যেতো।
তখন শহরের প্রায় সব রাস্তা ছিল কাঁচা বা মাটির। শুধু মাত্র প্রধান সড়ক, যেটা নগরবাড়ির দিক থেকে শহরের ভেতর দিয়ে ঈশ্বরদীর দিকে চলে গেছে- সেটার কোন কোন অংশ ছিল পিচের, কোন অংশ ঢালাই। এই সড়ক পথের ধারে মিউনিসিপ্যালিটির দেওয়া কিছু সুবিধা ছিল। যেমন মানুষজনের জল পানের জন্য প্রথম দিকে ছিল টিউবওয়েল, পরে হয়েছিল ট্যাংকি থেকে সরবরাহ করা ট্যাপকলের পানি।
তখন মানুষের মল ত্যাগের জন্য বাড়িতে বাড়িতে কাঁচা পায়খানা ছিল। মল ত্যাগ করতে হতো মাটির চারিতে। মেথর বা হরিজন পল্লীর লোকেরা প্রতিদিন সকালে এক ধরনের বড় পাত্রে সেই চারি থেকে মল ঢেলে নিয়ে যেতেন। সেগুলো তারা মাথায় করে কিছু দূরে গিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা গরুর গাড়িতে বিরাট ড্রামের মত পাত্রে ঢেলে দিতেন। ড্রাম বোঝাই হলে তা গরু দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হতো নগরবাড়ি যাওয়ার পথে ময়লাগাঢ় এলাকায়। রাস্তার ধারে থাকা সেই ময়লাগাঢ় মাঠে মানুষের মল জমা করা হতো। দুর্গন্ধ এড়াতে ওই পথ দিয়ে যানবাহন চলাচলের সময় যাত্রীদের নাকচেপে থাকতে হতো।
তখনকার সাধারণ মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খালি গায়ে লুঙ্গি পরে চলাফেরা করতেন। পায়ে চটিও থাকতো না অনেকের। যারা একটু ভদ্রলোক মানুষ ছিলেন, তারা লুঙ্গির সঙ্গে পাঞ্জাবি বা পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। তবে আরেক শ্রেণীর মানুষ লুঙ্গি বা পাজামার সঙ্গে কলার এবং বুক পকেটওয়ালা কোমরের নিচ পর্যন্ত নামানো এক ধরনের রঙ্গিন শার্ট পড়তেন। পায়ে রাবারের চপ্পল থাকতো। অনেকে আবার ধুতিও পরতেন।
গ্রামের মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করলেও গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল। বাইসাইকেলেরও ব্যাবহার ছিল। এছাড়া তিন চাকার রিকশা ছিল। সেগুলোর ভেঁপু বাজানো হতো রাবারের বল চেপে। এসব রিকশায় মেয়েরা চড়তেন শাড়িকাপড় পেঁচিয়ে, যাতে পুরুষদের চোখে পড়তে না হয়। তখন পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিক্য থাকলেও মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতর অধিকাংশেরই এক ধরণের ভিন্নতা দেখা যেতো। দিনের বেলা এরা ভাল মানুষের মত চললেও রাতের বেলা রায়ট বাঁধানোর নানা কান্ডে জড়িত হতেন।
তখন পড়াশুনার জায়গা বলতে ছিল মক্তব। এছাড়া সাধারণ স্কুল বা প্রাইমারি স্কুল ছিল। আর ছিল একমাত্র বিশাল এডওয়ার্ড কলেজ। মেয়েদের হাসপাতাল বলতে ছিল পৈলানপুরের ম্যাটারনিটি হাসপতাল। দোকান-পাট ছিল, কিন্তু একেবারেই হাতে গোনা এবং দূরে দূরে। মানুষ বাজারঘাট করতে শহরের বড় বাজার এবং টেবুনিয়া বা আরিফপুরের হাটে যেতেন। আমাদের এলাকায় বিক্রেতারা মাথায় করে দুধের হাড়ি নিয়ে আসতেন। কেউ কেউ সাইকেলে টিনের বাক্সে দুধ নিয়ে বের হতেন। এই দুধওয়ালাদের রীতিমত খাজনা দিতে হতো। মিউনিসিপ্যালিটির লোকেরা বাইসাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে এইসব দুধওয়ালাদের পাকড়াও করতেন এবং খাজনা আদায় করে চক দিয়ে তাদের দুধের পাতিলে চিহ্ন দিয়ে দিতেন। অন্যান্য জিনিসপত্র যেমন, শাড়ি-লুঙ্গি ইত্যাদিও বেচাকেনা হতো ফেরি করে। ফেরিওয়লারা জোরে জোরে ডাক ছেড়ে পণ্যের প্রচার করতেন।
[চলবে]



0 মন্তব্যসমূহ