স্মৃতির জানালা : তিন
আবুল হোসেন খোকন
উপরের ছবির মতই ছিল পৈত্রিক বসতবাড়ি। কাঁচা রাস্তার ধারে পূর্ব-পশ্চিমমুখি দুটি ঢেউটিনের ঘর। পূবেরটা বসত ঘর। মাঝখানে ফাঁকা রেখে পশ্চিমেরটা গুদামঘর, কাম বৈঠকখানা। তার পশ্চিমে খানিকটা ফাঁকা জায়গা, সেখানে একটা আমরাগাছ। তার দক্ষিণে লম্বা আরেকট ঢেউটিনের ঘর। এটা ছাত্রদের ম্যাচ। তারপরে খানিকটা ফাঁকা রেখে আরেকটা ঢেউটিনের বড় ঘর। এর পূর্ব সীমানার মাঝামাঝি একটা ইদারা এবং আমগাছ। পূবের কোণার দিকে একটি পুকুরমত গর্ত, সঙ্গে একজোড়া অব্যবহৃত পাকা ল্যাট্রিন। আগে ইদারা আর পুকুরমত গর্তের মাঝমাঝিতে ছিল প্রথম জীবনের মাটির কুড়ে ঘর। পরে আর থাকেনি। আলাদা জায়গায় নতুন ঘর করা হয়েছে কয়েকটা। তার একটা একবারে সীমানার মাঝখানে টেউটিনের বড়মত ঘর। মাঝমাঝির পূব পাশে ব্যবহার করা কূপ এবং টালির চালের রান্নাঘর। সামনে পশ্চিম দিয়ে উঠোনোর মাঝখানে একটা বরইগাছ। এই হলো ২৪ শতাংশ বসতবাড়ির হিসাব। এটা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কিছু আগের সময়ের কথা।
জায়গা কেনার পর বাবা নানাভাবে এইসব ঘরবাড়ি করেছেন। এ নিয়ে আমার অভিযোগের শেষ ছিল না। কারণ এখানে নৈতিকতার প্রশ্ন ছিল। যা আমাকে ছোট থেকেই প্রভাবিত করেছে। বাবা ওই জীবনে অনেক কিছু করেছেন। ফেরিওয়ালার কাজ থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি চাকরি পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে তিনি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। তার আগে একাধিক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তারও আগে সিএন্ডবি অফিসে চাকরি করতেন। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারিও করেছেন।
আমাদের বাড়ির দক্ষিণে ছিল শচীন্দ্র নাথ নামে এডওয়ার্ড কলেজে চাতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারি হিসেবে চাকরি করা এক ভদ্রলোকের। তাঁর বসতবাড়ির আকার ছিল আমাদের জায়গার চেয়ে দ্বিগুনেরও বেশি। তবে সীমানার মাঝ বরাবর দুই-তিনটা কানছকাটা টিনের ঘর নিয়ে ছিল তাঁর বসবাস। আমাদের জায়গা লতাপাতা দিয়ে ঘের দেওয়া থাকলেও তার কোন ঘের ছিল না। তার বাড়ির দক্ষিণে, অর্থাৎ আমাদের সীমানার একেবারে লাগোয়া জায়গায় ছিল বিরাট একটা লিচু গাছ। প্রচুর লিচু ধরতো, কিন্তু খাওয়ার লোক ছিল না। আমাদের সীমানার মধ্যে গাছের বড় একটা অংশ ছিল, সেটা থেকে লিচু ঝড়ে পড়তো। এছাড়া আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে ছিল আরেক হিন্দু পরিবারের বাড়ি। সেই বাড়ির ছেলের নাম নেপাল, বাবা তাকে ন্যাপলা বলে সম্বোধন করতেন। আর উত্তর দিকটায় কাঁচা রাস্তার পরে ছিল আরেক হিন্দু বুড়িমা’র বাড়ি। ওই বুড়ি আর তার বোন মিলে সীমানার মাঝামাঝি দিকে তিন-চারটা মাটির ঘরে থাকতেন। তাঁদের আর কেউ ছিল না। মাটির ঘরের কোন কোনটি ম্যাচ ভাড়া দিয়েও চলতেন। বুড়িমা’র বাড়িও আমাদের বাড়ির সমান এলাকা নিয়ে। সেই বাড়ির দক্ষিণ পাশে মাঠের মাঝমাঝিতে একটা এবং পশ্চিম-দক্ষিণ কোণায় আরেকটা বড় আম গাছ ছিল। প্রচুর আম ধরতো। ওগুলো বিক্রি করতেন বুড়ি মা। আমাদের বাড়ির পূর্ব পাশে ছিল সবচেয়ে প্রিয় খেলার সাথী শরীফ, আজিজ, জেসমিন, রুম, তুহিনদের বাড়ি। হাজী কুটির নামের এ বাড়ির মালিক বাবার বন্ধু আবদুস সোবহান খান। আর এই বাড়ির উত্তর এবং উত্তর পূর্ব কোণায় ছিল আরেক বন্ধু কয়েসদের (বাবা কাশেম মাস্টার) বাড়ি এবং হারাণ পাল নামে বিখ্যাত ঠাকুর বানানো কারিগরের বাড়ি। এই হলো, আমাদের বাড়ির আশপাশের একটা চিত্র।
আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে বামের দিকে গেলে পাওয়া যেতো রথঘর, সেখান থেকে দক্ষিণে প্রধান সড়কের পাশে গোলা। জায়গাটাকে গোলা বলা হতো। আর রথঘর থেকে পূর্ব দিকে গেলে ডিগ্রি কলেজের বিশাল মাঠ, উত্তরে এগুলে ডিগ্রি কলেজ হোস্টেল এবং তারও পরে ডিগ্রি কলেজের বেশ কয়েকটি ভবন। ডিগ্রি কলেজ হোস্টেলের বেশ আগে নকশাল বাচ্চু ভাইয়ের বাড়ির সামনে দিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে চলে গিয়েছিল কাঁচা রাস্তা। সেই রাস্তা আমাদের বাড়ি হয়ে চলে গেছে মক্তব এলাকায় থাকা প্রধান সড়কে। এটা বাড়ির আশপাশ এলাকার একটা চিত্র।




0 মন্তব্যসমূহ