Story

রিপোর্টারের
টুকরো
স্মৃতি
আবুল হোসেন খোকন
 
এক.
রিপোর্টার হতে তখন প্রাতিষ্ঠানিক কোন ডিগ্রির দরকার হতো না  শুধু রিপোর্টার কেন
সম্পাদক হতেও ডিগ্রি লাগতো না তবে একটা যোগ্যতা লাগতোসেটা হলোবামপন্থী হওয়া বিশেষ করে মার্কসবাদ-লেনিনবাদে ভাল পড়াশুনা থাকতে হতো যোগ্যতাই প্রাতিষ্ঠানিক সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে হার মানাতোআর বামপন্থী ক্যাডার হলে তো কথাই ছিল না
আমার যখন রিপোর্টারের আনুষ্ঠানিক হাতেখড়িতখন ১৯৭৯ সালদেশে ফ্যাসিবাদী শাসন সবে জেল থেকে বেরিয়েই  পথেতার ঠিক আগে বয়স কতোই-বাবড়জোড় ১৫পৈত্রিক বাড়ি ছিল পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লায়
এই হাতেখড়ির একটা ইতিহাস ছিলস্কুলে যাচ্ছেতাই খারাপ ছাত্র হলেও গল্পের বই পড়ায় দারুণ ঝোঁক ছিলপারলে রাতদিন ডুবে থাকতাম এভাবে শিশু বয়সেই অসংখ্য বইপড়া হয়ে যায় বন্ধু-বান্ধব এবং স্কুল লাইব্রেরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরির বই পড়ে পড়ে অন্যরকম এডভেঞ্চারি এবং অনুসন্ধানী চরিত্র তৈরি হয়েছিলমনোজগতে এরসঙ্গে যোগ হয়েছিল বিজ্ঞান আর ইতিহাসভিত্তিক বইপত্রের শিক্ষাসবশেষে যোগ হয়েছিল মার্কসবাদ-লেনিনবাদের দীক্ষা এবং বাম রাজনীতির ক্যাডার হিসেবে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার অভিজ্ঞতা বলা যায় বালক বয়সেই ষোলকলা পূর্ণ
লেখালেখির অভ্যাসটা তখন থেকেই শুরুটা ছিল ডায়েরি দিয়ে তারপর চিঠিপত্রকবিতা লেখা ছবি আঁকা এমনকি গল্পের বই লেখার চেষ্টাও বাদ যায়নিরাজনৈতিক জগতে প্রবেশের পর এসব লেখালেখি খুব কাজে লেগেছিলকার্যক্রমের নোট লেখাএজেন্ডা লেখাপ্রচারপত্র লেখাসভার বিবরণী তৈরি করা ছিল প্রধান কাজ এক সময় প্রেসরিলিজ লেখার দায়িত্বটাও আমার উপর এসে যায়সেই থেকে ‘সংবাদ’ লেখার একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়
আমার দারুণ আগ্রহ তৈরি হয়েছিলবিশেষ করে ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় (সাপ্তাহিক বিচিত্রা) ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ শিরোনামে সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের ধারাবাহিক লেখা আমাকে এতোটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যেএই পেশাটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলসাংবাদিকতা যে কতোবড় সম্মানের পেশাআমার কাছে তার একটা উদাহরণ ছিল শহরের রূপকথা রোডের ঘটনা
ওই রোডে প্রায়ই / জনের একদল সাংবাদিক রাতের বেলা পায়চারি করার মতো হেঁটে হেঁটে গল্প করতেন যদিও জনসংখ্যা তখন একেবারেই কম ছিল রাস্তায় কোন ভিড় ছিল নাএরকম সময় সাংবাদিক দল যখন রাস্তায় নামতেন তখন দুপাশের দোকানপাট-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একটা রাখঢাক পড়ে যেত বসে থাকা লোকজন চুপচাপ হয়ে যেতেনকেউ উচ্চস্বরে কথা বলতেন না কোন আলতু-ফালতু আচরণ করতেন নাসামরিক শাসনের সময়ের মতো সবকিছু ফিটফাটনির্ঝঞ্ঝাট হয়ে যেতআর লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন সাংবাদিকদের দিকেযেন তাঁরা সপ্তম আশ্চর্যের মানুষগুলোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেনআমিও ওভাবেই দেখতাম কেউ কেউ ইঙ্গিত করে বলতেন, ‘ওই যেওঁনারা কিন্তু সাংবাদিকসবাই সাবধান’ এটা কিন্তু ভয় পাওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নাসম্মানীদের সম্মান করতেইবা তাঁদের উপস্থিতিতে কোন বেয়াদবি হয়ে না যায়সেটা ঠিক রাখতেই  সাবধানতাযে / জন সাংবাদিক এভাবে হাঁটাচলা করতেন তাঁরা ছিলেন এডভোকেট রণেশ মৈত্রআনোয়ারুল হকমির্জা শামসুল ইসলামহাসনাতুজ্জামান হীরাআবদুস সাত্তার বাসুশিবজিত নাগরবিউল ইসলাম রবি  আবদুল মতিন খান
----- চলবে ----
 


 

রিপোর্টারের

টুকরো

স্মৃতি

-       আবুল হোসেন খোকন

 

দুই.
বেশ দ্রুতই কল্পনাতীত ফল মিললো। প্রেসরিলিজে সভা-সমাবেশের সংবাদ পাঠাচ্ছিলাম সংগঠনের প্যাডে।ছাপা হচ্ছিল রাজশাহী থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক বার্তা'য়। কাজের ভেতর দিয়ে প্রেরক হিসেবে প্রাপকের কাছে একটা পরিচিতি এসে যায়।ফলে আর প্যাডে লিখে সংবাদ পাঠানোর দরকার হচ্ছিল না।সাদা কাগজে পাঠালেই ছাপা হচ্ছিল।অবশেষে সংগঠনের সংবাদ পাঠানোর পাশাপাশি অন্য সংবাদও পাঠানো শুরু করলাম।ছাপাও হতে লাগলো। তখন পাবনা প্রতিনিধি ছিলেন অধ্যাপক শিবজিত নাগ।তাঁরসঙ্গে আমার কোন পরিচয় বা জানাশোনা ছিল না।তাঁর সংবাদগুলো ছাপা হচ্ছিল নিজস্ব সংবাদদাতা পরিচিতিতেআমারগুলো সংবাদদাতা হিসেবে।
ঠিক এরকম সময় আমাদের দলীয় সংবাদপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ পুনঃপ্রকাশ ঘটলো।এর অফিস ছিল রাজধানী ঢাকার টিপু সুলতান সড়কে।পত্রিকাটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন জাসদের দাদাখ্যাত সিরাজুল আলম খান।সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন জাসদ নেতা মির্জা সুলতান রাজা।আমি তখন সাংবাদিক হিসেবে দলের নিজস্ব সংবাদপত্রে যুক্ত হতে পারাকেই প্রাধান্য দিলাম। সে অনুযায়ী কারও সঙ্গে লবিং না করেই সংবাদ পাঠানো শুরু করলাম।আর তা ছাপাও হতে লাগলো। এভাবে শুরু হলো পাবনা থেকে প্রাথমিক সাংবাদিকতা।
অবশ্য দৈনিক বার্তায়ও আর্থ-সামাজিক বিষয়ের উপর প্রবন্ধ এবং সাহিত্য বিষয়ে লেখা পাঠাতে থাকলাম।এগুলো বেশ গুরুত্বসহকারে ছাপা হতে লাগলো। এমনকি প্রবন্ধগুলো উপ-সম্পাদকীয় কলামে প্রকাশ হলো।আমাকে দেখলে বা বয়স জানলে বিভাগীয় সম্পাদকরা হয়তো  লেখা মোটেও ছাপতেননা। কারণ এতো ছোট বয়সের লেখাগুলো আমারতা বিশ্বাসই করতে চাইতেন না।আমাকে না জেনেই সম্পাদকরা আমার লেখা প্রকাশের জন্য নির্বাচিত করছিলেনএর মানে হলোলেখাগুলোর মানভারত্ব এবং গুরুত্ব ছিল যথাযথ। ঘটনায় আমার ভেতর এক ধরনের আত্মবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছিলযা পরবর্তীতে কলাম লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। আরেকটা বিষয়ও প্রমাণ হয়েছিল যেমার্কসবাদী-লেনিনবাদী দীক্ষার শক্তি অনেক অনেক বড়।
 
সাংবাদিকতা শুরু হলো। কোন আইডি বা নিয়োগ-পরিচয়পত্র ছিল না।কিন্তু এটা না হলে সাংবাদিক হিসেবে বৈধতা থাকে না।আবার প্রেসক্লাবের সদস্যও হওয়া যায় না।প্রশ্নটা যখন এসে গেল তখন পরিচয়পত্র বা নিয়োগপত্র পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। গণকণ্ঠ থেকে এগুলো পাওয়ার জন্য যোগাযোগ করলাম।পাঠানো খবরের সঙ্গে চিঠি লিখলাম। জানিয়ে রাখলাম কবে ঢাকায় যাবো।
তখন দ্রুত যোগাযোগের কোন মাধ্যম ছিল না।সবচেয়ে দ্রুতর একটা মাধ্যম ছিল টেলিগ্রাম। টরে-টক্কা সিস্টেমে এটা পাঠানো হতো।মেজেস লিখতে হতো ইংরেজিতে। ঢাকায় পৌছানোর পর ঘণ্টা দুই-তিনেকের মধ্যে অফিসে যেতো। আর একটা মাধ্যম ছিল টেলিফোন।এর জন্য টেলিফোন অফিসে যেতে হতো। কল বুক করতে হতো।তারপর লাইন পাওয়ার জন্য অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বসে থাকতে হতো।কখনও কখনও সারাদিনও লেগে যেতো।বড় কথা হলো টেলিফোনে মোটা টাকা খরচ হতো।এসব কারণে প্রথম প্রথম  দুই মাধ্যমে সংবাদ পাঠাতাম না।পাঠাতাম খামে ভরে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে। পাঁচ পয়সা দিয়ে নয়/চার মাপের একটা খাম কিনতাম। সংবাদ লিখতাম।তারপর খামে ভরে মুখ না লাগিয়ে উপরে লিখে দিতাম প্রেস ম্যাটার/খোলা ডাকব্যস তিন/চারদিনের মধ্যে খাম ঢাকার অফিসে পৌছে যেতো।
 
নির্দিষ্ট দিনে ঢাকা গেলাম। গণকণ্ঠ ভবন খুঁজে বের করলাম। চারতলা ভবন।যখন গেলাম তখন বিকেল। সংবাদপত্র অফিসে কাজ শুরুর সময়।নিচতলায় প্রেস এবং উপর তলাগুলোতে কম্পোজ-বার্তা বিভাগ এবং সম্পাদকদের রুম।আমি সরাসরি মফঃস্বল সম্পাদকের কাছে চলে গেলাম। তাঁর নাম সাইফুল আলম বাবুল।তিনিও অল্প বয়সী। আমি অবশ্য একাধিক কাপড়-চোপড় পরে নিজেকে ভারিক্কি এবং মোটা বানানোর চেষ্টা করে হাজির হয়েছিলাম।বাবুল ভাই বেশ আন্তরিকভাবে সব জেনে-শুনে আমার আইডি কার্ড প্রস্তুত করলেন।তারপর সম্পাদকের কাছে গিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে আনলেন।সবশেষে আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি নিজের প্রাণ ফিরে পেলাম।যখন সাংবাদিকতায় বৈধতা পেলাম তখন ১৯৭৯ সালের শেষার্ধ।আইডি কার্ডে আমার পদবী লেখা হয়েছিল মফঃস্বল সংবাদদাতাপাবনাএই হলো আমার আনুষ্ঠানিক সাংবাদিকতার শুরু।
 
------- চলবে -------
 

রিপোর্টারের
টুকরো
স্মৃতি
আবুল হোসেন খোকন
 
তিন.
সাংবাদিকতায় নামলাম কিন্তু  সম্পর্কে কোন পড়াশুনা ছিল না।রাজনীতিতে থাকার কারণে রাষ্ট্রপররাষ্ট্রসমাজরাজনীতিঅর্থনীতিসাহিত্য-সংস্কৃতিইতিহাস ইত্যাদির উপর যে হাজারখানেক বইপত্র পড়াশুনা ছিলতা দিয়েই কাজ চালাচ্ছিলাম। কিন্তু সাংবাদিকতার বিধিবদ্ধ রীতি-নীতিসংবাদ লেখা বা গঠনের বিধানএসব জানা ছিল না। সময় পর্যন্ত জানতাম না যে লেখা সংবাদ-এর ইন্ট্রো কতো শব্দের মধ্যে হতে হবেসংবাদের গঠনপ্রণালী কিফিচার-প্রবন্ধ আর সংবাদ-এর মধ্যে পার্থক্য কোথায়।সাধারণ জ্ঞানে শুধু জানতাম অঘটনই সংবাদআর এটা লিখতে গেলে কে কি কেন কবে কোথায় কীভাবেএইসব প্রশ্নের উত্তরগুলো থাকতে হবে।আমি এটাই অনুসরণ করছিলাম।
শিখতে হয় পড়ে নয়তো করে আমি ছিলাম করে শেখার পর্যায়ে।অবশ্য করে শেখার উপরে কোন শেখা  যে নেইসেটা আজও বুঝি।একজন পড়ে পড়ে যতোই শিখুন না কেনকাজ করতে গেলে তিনি মোটেও পারবেন না। কিন্তু কাজ করে করে শেখা একজন তা পারবেন সুন্দরভাবে।
 
কাজ শুরু করলাম। প্রতিদিন একটা-দুইটা করে সংবাদ পাঠাচ্ছিলাম।ছাপা হচ্ছিল চমৎকারভাবে। লেখার মধ্যে গুণগত মানও বাড়ছিল।যতো কাজ করছিলাম ততো শিখছিলাম।ফলে Practical কাজের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠছিল অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গিতাছাড়া নিজের মধ্যে সব সময়ই একটা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিলসেটা হলো লেখার ভেতর দিয়ে মুক্তিকামী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করতে হবে। শ্রেণী-বৈষম্যের সমাজে এটাই সাংবাদিকতার আসল কথা বলে বিশ্বাস করতাম।ফলে নানা অঘটনের পাশাপাশি শোষণ-বঞ্চনা-লুণ্ঠন-নির্যাতন-দমন-পীড়ন এবং গণবিরোধী ঘটনার বিষয়গুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলাম। একটি সুন্দর-সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থার ক্ষেত্র তৈরির দিকে নজর রাখছিলাম।আসলে যে উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে নেমেছিলামসেই উদ্দেশ্যটাকে লেখনীর ভেতর দিয়ে বিকশিত করতে চাইছিলাম। এমনিতে আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার ছিল না।এই কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে হবেএমন বাসনা কখনই ছিল না।মানুষের ভালবাসা পাওয়ার একটা বিষয় ছিল।সেটা অবশ্যই মানুষের জন্য সত্যিকারের কাজ করার ভেতর দিয়ে চেয়েছিলাম।
 
তখন লেখা লিখতাম খুবই যত্ন করে। কোন কাটাকাটি বা ভুল থাকতে দিতাম না।প্রয়োজনে কাগজ ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে লিখতাম।দীর্ঘ সময় ব্যয় করতাম একটা লেখা লিখতে।এমনিতে তখন হাতের লেখাও ছিল খুবই চমৎকার।গোটা গোটা অক্ষরে পরিস্কার পাতায় লিখে খামে ভরে পোস্ট করে আসতাম।এতেকরে পত্রিকায় আমার লেখা এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যেবার্তা বিভাগকে একটা অক্ষরও কাটতে হতো না।আর খবরগুলো ছাপা হচ্ছিল বেশ বড় বড় হেডিংয়ে গুরুত্বসহকারে।
এই লেখার ভেতর দিয়ে দৈনিক গণকণ্ঠে আমার পদবী মফঃস্বল সংবাদদতা থেকে নিজস্ব সংবাদদাতাপাবনা হলো। তারপর হলো পাবনা জেলা প্রতিনিধিএক পর্যায়ে গোটা উত্তরবঙ্গের সংবাদও লিখতে লাগলাম।এরমধ্যে একদিন দলীয় সফরে পাবনা এসেছিলেন সম্পাদক মির্জা সুলতান রাজা।বনমালী ইনস্টিটিউটের ভরা সমাবেশে তিনি আমার সম্পর্কে বলেছিলেনদৈনিক গণকণ্ঠে দেশের মধ্যে যে তিন/চারজন সবচেয়ে ভাল সাংবাদিকতা করছেনতারমধ্যে আমিও একজন।
 
আমাকে পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য করে নেওয়া হয়েছিল।ছোট হওয়ার কারণে ক্লাবের সবাই আমাকে খুব ভালবাসছিলেন।এইসঙ্গে খ্যাতিমান সাংবাদিকদের সঙ্গে মিশতে মিশতে সাংবাদিকতার খুঁটিনাটিও শিখে ফেলছিলাম।বিশেষ করে অধ্যাপক শিবজিত নাগএডভোকেট রণেশ মৈত্রআনোয়ারুল হকমির্জা শামসুল ইসলামআবদুস সাত্তার বাসুরবিউল ইসলাম রবিআবদুল মতীন খানের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ।
 
আমাদের সাংবাদিকতা চলছিল খুব আনন্দময় ভাবে।আমরা কয়েকজন একসঙ্গে দল ধরে বিভিন্ন অফিস-প্রতিষ্ঠানে যেতাম। সেখানে কাজ-কর্মের তথ্য নিতাম। কোন অভিযোগ থাকলে তা ক্রসকানেকশন করে যাচাই করতাম।তারপর পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিতাম। সেগুলো ছাপা হচ্ছিল বেশ গুরুত্বসহকারে।এইদিক থেকে আমার গণকণ্ঠরবি ভাইয়ের সংবাদমতীন ভাইয়ে কিষাণ এবং পরে বাংলার বাণী সবচেয়ে প্রাধান্য পাচ্ছিল।কারণ এই সংবাদপত্রগুলো তখন আমাদের স্টাইলে পাঠানো প্রতিবেদনগুলোকে পছন্দ করছিল। আমরা যে শুধু দল বেধে সাংবাদিকতা করতামতাই- নয়।আমরা পত্রিকার পলিসি অনুযায়ী আলাদা আলাদাভাবে প্রতিবেদনও লিখছিলাম।বিশেষ করে সিনিয়র সাংবাদিকদের এটা বেশি করতে হতো।কারণ দৈনিক বাংলাইত্তেফাকঅবজারভারটাইমস ইত্যাদি সংবাদপত্রগুলো ছোচ ছোট ঘটনার সংবাদগুলোকে গ্রহণ করতো।গণকণ্ঠ মতো বড় বড় আইটেম লেখার সুযোগ এগুলোতে ছিল কম।
 

--------- চলবে ----------


 

 

রিপোর্টারের

টুকরো

স্মৃতি

আবুল হোসেন খোকন

 

চার.

রির্পোটিং ভালই চলছিল। তবে একটা পর্যায়ে এসে এটা দ্বিখন্ডিত হয়ে গিয়েছিল।অর্থাৎ নিউজ করতে করতে সম্পাদনার দায়িত্বও চেপে বসেছিল।এরই জের ধরে পরবর্তীতে সম্পাদক কাম রিপোর্টার হয়ে বছরের পর বছর কাজ করতে হয়েছে। সে বিষয়ে পরে আসছি।


খবর সংগ্রহ করছিলামলিখছিলামতারপর তা পত্রিকায় পাঠাচ্ছিলাম।আর পত্রিকায় সেগুলোই ছাপা হচ্ছিল। তখন এরশাদের সামরিক শাসনের সময়তাই রিপোর্ট ছাপা হওয়া মাত্র অ্যাকশন হচ্ছিল। এতেকরে নিজের মধ্যে একটা সাফল্যের ভাব ছিল। রিপোর্টের পাশাপাশি দৈনিক বার্তা ছাড়াও কিছু সাপ্তাহিকে প্রবন্ধ বা কলামও ছাপা হচ্ছিল। রকম পর্যায়ই শেষ পর্যন্ত আমাকে সম্পাদনা এবং কলাম লেখকের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল।

 

দৈনিক গণকণ্ঠকে ভিত্তি করে সাংবাদিকতা শুরু হলেও পত্রিকাটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সম্ভবত তখন ১৯৮৩ সাল। হঠাৎ করে গণকণ্ঠর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেল। আমি বেকার হয়ে গেলাম। গণকণ্ঠ আর বের হওয়ার অবস্থায় থাকলো না। স্বাভাবিকভাবেই রিপোর্টিংয়ে বাধা পড়লো। তখন দৈনিক বার্তায় সাহিত্য-সংস্কৃতি আর কলাম পাতায় লিখে সময় কাটাতে হচ্ছিল। কিন্তু রিপোর্টিংয়ের মানুষ আর কতোক্ষণই-বা রিপোর্টিং ছাড়া থাকতে পারেবাধ্য হয়ে অন্য জায়গায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা শুরু করলাম।

তখন বগুড়া থেকে দৈনিক উত্তরাঞ্চল নামে একটি সংবাদপত্র বেরুতো। এটি ছিল ওই সময়ের দারুণ প্রভাবশালী দৈনিক। এর সম্পাদক ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য বাম রাজনীতিক দুর্গাদাস মুখার্জী। এই দুর্গাদাস মুখার্জী আর মুহম্মদ আবদুল মতিন ছিলেন স্বাধীনতা পূর্ব অবিভক্ত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠক। দুজন সমপর্যায়ের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। পরবর্তী সময়ে দুর্গাদাস মুখার্জী দৈনিক উত্তরাঞ্চল বের করেন। এই পত্রিকার লেখাগুলো আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। সুতরাং এটাতেই যুক্ত হওয়ার চিন্তা করলাম। তখনকার বাস্তবতায় নিউজ পাঠিয়ে যোগ্যতা প্রমাণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। সুতরাং আমি লেখা পাঠানো শুরু করলাম। আরকিছুদিন যেতে না যেতেই দেখলাম বেশ গুরুত্বসহকারে আমার নিউজ ছাপা হচ্ছে। যখন আরও কিছুদিন গেলএবং অনেকগুলো নিউজও বড় শিরোনাম করে ছাপা হলোতখনই সরাসরি যোগাযোগের উদ্যোগ নিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সাড়াও পেলাম। অফিস থেকে আমাকে দেখা করতে বলা হলো। তার আগে অবশ্য আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিউজ টেলিফোনে পাঠিয়েছিলাম। অনেক নিউজের সঙ্গে ছবিও থাকছিল। সেই সুবাদে টেলিফোন বিল এবং আইডি কার্ড চেয়ে দুটো আবেদনও করে রেখেছিলাম।

 

এরইমধ্যে পাবনার পীরপুর চরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হলো। সময়টা ছিল ১৯৮৫ সালের ৩১ মার্চ। ঘূর্ণিঝড়ে বহু লোক মারা গিয়েছিল। গোটা পীরপুর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। ঝড় রাতে হয়েছিলসকাল বেলা হেলিকপ্টারে করে দেখতে এসেছিলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। আমরাও গিয়েছিলাম। নিউজ হিসেবে এটা ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা। ক্যামেরায় অনেক ছবি তুলে সেখান থেকে শহরে এসে বগুড়ায় টেলিফোন করে নিউজটি দিয়েছিলাম। সম্পাদক দুর্গাদাস মুখার্জী বললেনশুধু নিউজ দিলে হবে নাআমি যেন কালবিলম্ব না করে ছবি নিয়ে বগুড়া চলে আসি। আমার ছবিগুলো তখনও ক্যামেরায়। প্রিন্ট করিনি। প্রিন্ট করতে যথেষ্ট সময় লাগবে। আর তখন সরাসরি বগুড়ায় না গিয়ে ছবি পৌছানোর কোন উপায়ও ছিল না। সুতরাং পীরপুর চর থেকে শহরে টেলিফোনের কাজ সেরেই বগুড়ার বাসে উঠে পড়লাম। সকালে রওনা দিয়ে দুপুর নাগাদ বগুড়া পৌছলাম। অফিস খুঁজে বের করে সম্পাদককে ক্যামেরা দিয়েদিলাম। তিনি ছবিগুলো প্রিন্ট করানোর ব্যবস্থা করলেন।

 

প্রতিথযশা সাংবাদিক-রাজনীতিক দুর্গাদাস মুখার্জী অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির মানুষ হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের প্রভাবশালীরা তাঁকে খুব ভয় করতেন। কারণ তিনি কাউকে পরোয়া করতেন না। তাঁর অফিসের কর্মী থেকে শুরু করে সব সাংবাদিকরাও তাঁকে বাঘের মতো ভয় পেতেন। পরবর্তীতে আমি যেটা বুঝেছিলাম সেটা হলোতিনি ছিলেন বজ্র আটুনি আর ফস্কা গেড়ো মতো।

আমার ঘটনা দিয়েই বলি। আমি পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি-সম্পাদক সাক্ষরিত টেলিফোন বিল দাখিল করলাম। কারণ প্রেসক্লাব থেকে করা টেলিফোন কলের বিলগুলো একসঙ্গে আসতো। পরে যার যার কল অনুযায়ী বিল তৈরি করে দিতেন সভাপতি-সম্পাদক। কিন্তু দুর্গাদাস মুখার্জী সেটা মানলেন না। তিনি বললেনযার বিল তারটা টেলিফোন অফিস থেকেই দিতে হবে। অন্য কাওকে দিয়ে করা বিল বৈধ হবে না। তখন ভাবলাম তিনি হযতো টেলিফোন বিলযাতায়াত বিলফটোর বিলকিছুই দেবেন না। বেশ হতাশ হয়ে বসে রইলাম। তিনি উপরতলায় চলে গেলেন।

 

বগুড়ার কাটনার পাড়ায় দ্বিতল বাড়িটিই তাঁর অফিস এবং বাড়ি। আমি যখন খুব অসহায় বোধ করে পাবনা ফিরবো কিনা ভাবছিলামতখন উপরতলায় ডাক পড়লো। গেলাম। দেখি টেবিলের উপর অনেক রকম খাবার সাজানো। আমাকে সঙ্গে করে তিনি খাবেন। খেলাম। কথা বলতে বলতে পেটপুড়েই খেলাম। তিনি জবরদস্তি করে নানান রকম মিষ্টিও খাওয়ালেন। শেষে বিকাল বেলা বিদায়ের সময় তিনি একটা খাম তুলে দিলেন। যাতে ছিল টেলিফোন বিলছবির বিলসহ যাবতীয় খরচের টাকা এবং আইডি কার্ড।

আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। এতো বড় মাপের মানুষের কাছ থেকে এতো আন্তরিকতাএকাত্মতা আমার কল্পনায়ও ছিল না।

ওইদিনের খবরটা ছিল পরেরদিনের সব সংবাদপত্রের ব্যানার লিড নিউজ। আমার রিপোর্টও ব্যানার লিড হয়েছিল। সঙ্গে ছিল অনেকগুলো ছবি।

দৈনিক উত্তরাঞ্চল মানুষের মাঝে এতোটাই স্থান দখল করে নিয়েছিল যেবগুড়ার বাইরে পাবনায় এর অন্তত ৫০ কপি কাগজ চলছিল। কোনদিনও অবিক্রিত থাকেনি। ফলে চাহিদা কেবলই বেড়েছিল।

 

------------ চলবে -----------


 

 

রিপোর্টারের

টুকরো

স্মৃতি

আবুল হোসেন খোকন

 

পাঁচ.

এদিকে পীরপুরের ঝড় নিয়ে আরেক কাРঘটে গিয়েছিল ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি দেখে ছবি তোলার জন্য টাকা দিয়েছিলেন ইত্তেফাকের শ্রদ্ধেয় আনোয়ার ভাই (আনোয়ারুল হক) কথা ছিল ঘটনাস্থল থেকে ফিরেই ছবি প্রিন্ট করিয়ে তাঁকে দেবো কিন্তু আমিতো ফিরেই বগুড়া চলে গেছি প্রিন্ট করানোর সুযোগই পাইনি  অবস্থায় আনোয়ার ভাই আমাকে আর খুঁজে পাননি ফলে তিনি তাঁর কাগজে ছবি পাঠাতে পারেননি  ব্যর্থতার কারণে তাঁকে ডেস্ক থেকে দারুণ রকম বকা খেতে হয়েছিল

আমি বগুড়া থেকে ফিরেছিলাম রাতে তখন বন্ধ হয়ে গেছে ছবি প্রিন্টের স্টুডিও পাবনা নিউ মার্কেটে মিনার্ভা স্টুডিও নামে একটি জায়গা থেকে ছবি প্রিন্ট করাতাম স্টুডিওর মালিক অরুণ সরকার নিজে আমার কাজগুলো করে দিতো আনোয়ার ভাই স্টুডিও বন্ধ হওয়ার আগে কয়েক দফা সেখানে ঢু মেরেছেনকিন্তু আমার কোন খবর পাননি কারণ আমি অরুনের সঙ্গে যোগাযোগই করতে পারিনি সব মিলে পরের দিন আমাকে ছবি করে ভয়ঙ্কর লজ্জা আর অপরাধবোধ নিয়ে আনোয়ার ভাইকে সেগুলো দিতে হয়েছিল এসব কারণেই ঘটনাটি চীর স্মরণীয় হয়ে আছে

 

সামরিক শাসনামলের এই সময়গুলোতে সাংবাদিকদের আড্ডার জায়গা পাবনা প্রেসক্লাব ছাড়াও কয়েকটি জায়গায় ছিল এরমধ্যে একটা জায়গা হলো আবদুল হামিদ সড়কে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পাশে লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডার এখানে কাজ না থাকলে সকাল বেলা থেকে দুপুর এবং বিকেলে বসতেন শ্রদ্ধেয় আনোয়ার ভাই (আনোয়ারুল হক), অধ্যাপক শিবজিত নাগকমিউনিস্ট নেতা প্রসাদ রায়মির্জা শামসুল ইসলামআবদুস সাত্তার বাসু ভাই এবং এডভোকেট রণেশ মৈত্র এই আড্ডাটা ছিল নিয়মিত লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডারের সঙ্গেই ছিল ন্যাপ নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাইয়ের বইয়ের দোকান সেখানে বসতেন তাঁর ছোট ভাই সংবাদের রবিউল ইসলাম রবি বসতেন আবদুল মতীন খানও পাশাপাশি বলে সবাই এদিক-ওদিক বসতেন আমারও এই জায়গাগুলোতে সংযোগ বেড়েছিল

আরেকটা বসার জায়গা ছিল অন্নদা গোবিন্দা পাবলিক লাইব্রেরি এই লাইব্র্রেরির সম্পাদক ছিলেন  শ্রদ্ধেয় মনোয়ার হোসেন জাহেদী স্যার তিনি সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব তাঁরসঙ্গে কাজ করতেন রবি ভাই এবং মতীন ভাই সে কারণে বিকেল-সন্ধ্যার দিকটাতে এখানেও আড্ডা হতো তাছাড়া জাহেদী স্যার ছিলেন বাংলার শিক্ষক হিসেবে সাহিত্য বিষয়ে পণ্ডিৎ ফলে সাংস্কৃতিক  সাহিত্যের আড্ডা জমতো তাঁকে নিয়েই

আমি এসব জায়গায় কখনও নিয়মিতকখনও অনিয়মিত যাতায়াত করতাম যেহেতু একেবারেই জুনিয়র ছিলামতাই নিজস্ব বসার জায়গা হিসেবে বেশি ব্যবহার করতাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের সামনে কাকলি বইঘরের সুশান্তর দোকানে এই দোকানে আমার সমবয়সীদের নিয়ে আড্ডা জমতো এতে যোগ দিতেন বিশেষ করে শুচি সৈয়দসমজিৎ পালমোস্তাফা আরব সতেজনাজিম উদ্দিন সরদার খোকা আড্ডাবাজদের মধ্যে শুচি সৈয়দ কিশোর বয়স থেকে কবি  সাংবাদিক এখন দৈনিক যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক সমজিৎ পালও কবিবিশেষ করে ছড়াকার এখন তিনি ডক্টরেট করে ঈশ্বরদী ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রের শীর্ষ কর্মকর্তা মোস্তফা সতেজ কিশোর বয়স থেকে কবি  গল্পকার এখন তিনি পাবনা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদক নাজিম উদ্দিন খোকা দেশপ্রেমিক একজন খাঁটি মানুষ তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত যাইহোক আমাদের বেশি অড্ডা ছিল কাকলি বইঘরে এছাড়াও শামীম আহমেদ বাবু নামে আমাদের একজন অতিপ্রিয় ছোট ভাই ছিল তার একটি হোসিয়ারি দোকান আছে আদমজী গলিতে খোকা ভাই এবং আমি এখানে অনেক সময়ই আড্ডা দিয়েছি

 

কাকলি বইঘরের মালিক সুশান্ত এবং মিনার্ভা স্টুডিওর মালিক অরুন সরকারকে নিয়ে কিছু বলা প্রয়োজন অরুন সরকার শিশু বয়স থেকেই নকশাল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল  কারণে জেলে গেছে শিশু থেকে কিশোর বয়সে উঠতির সময় একই বয়স এবং ঘটনা আমারও তবে আমি নকশাল ছিলাম না ছিলাম জাসদেগণবাহিনীতে আমিও জেলেঅরুনও জেলে বয়স কম বলে আমাদের রাখা হয়েছিল ‘ছোকরা ফাইল’ নামে কিশোরদের জেলকক্ষে পাশাপাশি থাকতে গিয়ে আলাপ-পরিচয়এবং শেষে ঘনিষ্ঠতা হয় তারপর আমিও জেল থেকে মুক্তি পাইঅরুনও পায় আর আমাদের দেখা হয়নি তবে দেখা হলোনিউ মার্কেটে মিনার্ভা স্টুডিও হওয়ার পর এই দেখাটা হয়েছিল আমারই বন্ধু নূর উজ জামান খোকনের বদৌলতে কী করে যেন খোকন মিনার্ভা স্টুডিওর সঙ্গে খাতির জমিয়ে অরুনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে সেই সুবাদে আমাকে একদিন সেখানে নিয়ে যায় এরপর অরুনকে পাই জানতে পারিসে আর নকশাল রাজনীতির সঙ্গে নেই এখন ফটোগ্রাফির ব্যবসায় নেমেছে সাংবাদিক হিসেবে আমারও প্রয়োজন ছিল ফটোগ্রাফির কাজ করা স্টুডিও সেটা মিলে যায় এভাবেই

যে সুশান্তর কথা বলেছিতিনি ছিলেন দারুণ ভাল মানুষ আমাদেরকে দোকানে বসিয়ে রেখে কোথায় যে লাপাত্তা হয়ে যেতেনতার ঠিক ছিল না টাকা-পয়সার বাক্সবেচা-কেনা ফেলে রেখে তিনি তার কাজে চলে যেতেন তিনি জানতেন আমরা থাকলে তার এক পয়সাও খোয়া যাবার ভয় নেই আমরাও সেটা মেনে নিয়ে দোকানে বসতাম দোকানদারীও করতাম বইপত্রের দোকানখারাপ না তা ছাড়া বগুড়া থেকে প্রকাশিত যে দৈনিক উত্তরাঞ্চলসেটার এজেন্সিও করে দিয়েছি সুশান্তকে

অরুন আর সুশান্তর কথা বলছি একটি কারণে তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রাতারাতি কাউকে কিছু না জানিয়ে ভারতে পাড়ি দিচ্ছিলেন তারা যাবেন বা যাচ্ছেন কথা কাক-পক্ষীকেও জানতে দিতেন না পাশের বাড়ির কেউ জানতেন না তারা চলে যাবেন সকাল বেলা উঠে তারা দেখতেনঘর-দুয়ার ফাঁকা কেউ নেই তার মানে বুঝে যেতেনরাতের কোন এক সময় তারা সব ফেলে ভারতে চলে গেছেন  আমার এই দুইজনের ব্যপারেও তাই ঘটেছিল তবে তাদের যাবার কথা কেউ- জানতে না পারলেওঅরুনের ব্যাপার জানতাম আমি আর নূর উজ জামান খোকন অরুন আমাদের এতোটাই বিশ্বাস করতো যেআমাদের  কথাটা কদিন আগেই জানিয়ে রেখেছিল আর সুশান্ত জানিয়েছিল খোকা আর আমাকে একদিন আগের রাতে আমাদের দুজনকে ডেকে বিদায়ী ভোজও করিয়েছিল এজন্য এসব কারণেই তাদের দুজনকে ভুলতে পারিনি

 

------ চলবে ------


 

 

রিপোর্টারের

টুকরো

স্মৃতি

আবুল হোসেন খোকন

 

ছয়.

এর বেশ আগে একটা কান্ড ঘটে যায় সন্ধ্যারাতে প্রেসক্লাবে যেতেই শিবজিত দা হঠাৎ ডেকে নিয়ে গেলেন ছাদের দিকে বললেনতিনি পাবনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বিবৃতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রকাশক ইয়াসিন আলী মৃধা রতন তাঁকে বার বার অনুরোধ করছেন সে কারণে তিনি তার অনুরোধে সাড়া দিতে চান  তাঁর নিজের সঙ্গে নিতে চান আমাকেও অর্থাৎ শিবজিত দা আর আমি নতুন হিসেবে সাপ্তাহিক বিবৃতিতে যোগ দেবো

বিবৃতি পত্রিকা পাবনার অত্যান্ত প্রভাবশালী সংবাদপত্র পাবনা থেকে এসময় দুটি সংবাদপত্রই বের হচ্ছিল একটি বিবৃতিআরেকটি সাবেক বামপন্থী নেতা শফিউর রহমান খানের সম্পাদিত সাপ্তাহিক পাবনা বার্তা এর প্রকাশকও শফিউর রহমান খান বিবৃতির সম্পাদক ছিলেন শফিকুল ইসলাম শিবলীসংক্ষেপ লেখা হতো শিবলী তিনি একাধারে কবিসাংবাদিক এবং আইনজীবী পরে জেনেছিলামকোন কারণে তাঁর সঙ্গে প্রকাশক রতন ভাইয়ের সম্পর্কের অবণতি ঘটে শিবলী ভাই পদত্যাগ করেন তখন রতন ভাই নতুন সম্পাদক খুঁজছিলেন তিনি শিবজিত দাকে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছেন এই ঘটনা থেকেই দাদাকে ওই দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব বা অনুরোধ জানানো হয় দাদা আমাকে সঙ্গে রাখার শর্তে এতে রাজী হন

দাদার প্রস্তাব আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলাম তারপর একদিন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে দাদা এবং আমি বিবৃতিতে যুক্ত হই শিবজিত দা শিক্ষকতায় সরকারি চাকরিতে ছিলেন বলে সম্পাদক হিসেবে তাঁর নাম প্রিন্টার্স লাইনে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না  অবস্থায় তিনি সম্পাদক থাকলেও প্রিন্টার্স লাইনে অবৈতনিক সম্পাদক পদবী ব্যবহার করেন এতেকরে সরকারি চাকরি করে অন্য কোথায়ও লাভজনক চাকরি করার বিধান থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা সুযোগ ছিল অবশ্য প্রতিপক্ষের কেউ কেউ এরপরেও হেনস্তা করতে ছাড়েনি যাইহোকআমার দায়িত্ব প্রথমে হয় নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে পরে এক ঘটনায় প্রকাশক আমার পদবী লিখেছিলেন বার্তা সম্পাদক হিসেবে শেষে এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও আমাকে নিতে হয়েছিল

সে যাইহোকশুরু থেকেই এই পত্রিকার মূল ছিলেন প্রকাশক রতন ভাই এবং শিবলী ভাই ছাড়াও জাহাঙ্গীর আলম মুকুলশ্যামল দত্তআবু মুহাম্মদ রইসশুচি সৈয়দসমজিৎ পালমোস্তফা আরব সতেজসেলিনা খান শেলীশামসুল আলম বকুলমুকুল আহমেদজয়নাল আবেদীনঅমল কান্তি সরকারসহ অনেকে এঁরা সবাই ছিলেন পাবনায় কবিতা চর্চার সুপরিচিত সংগঠন কবিকণ্ঠ কর্ণধার এক কথায় কবিকণ্ঠ থেকেই জন্ম নেয় বিবৃতি দাদাসহ আমি যখন এখানে যুক্ত হলাম তখন পেয়েছি জাহাঙ্গীর আলম মুকুলশ্যামল দত্তশুচি সৈয়দসমজিৎ পালমুকুল আহমেদকামাল আহমেদজয়নাল আবেদীন এবং অমল কান্তি সরকারকে এরমধ্যে জাহাঙ্গীর আলম মুকুল এবং শ্যামল দত্ত ঢাকা চলে গেলেনসেখানেই তাঁরা দায়িত্ব পালন করতে থাকলেন রইলাম মাত্র শিবজিত দা এবং আমিসহশুচি সৈয়দসমজিৎ পালমুকুল আহমেদজয়নাল আবেদীন এবং অমল কান্তি সরকার

এখানে আরেকটা কথা বলতে হয় সেটা হলো বিবৃতি যেমন জন্ম নিয়েছিল কবিকণ্ঠের ঘর থেকেতেমনইভাবে বিবৃতির ঘর থেকে জন্ম নিয়েছিল পাবনার অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন গণশিল্পী সংস্থা

 

বিবৃতি ছাপা এবং প্রকাশ হতো বেনিয়া পট্টির বাণী মূদ্রণ থেকে এই প্রেসের মালিকও ইয়াসিন আলী মৃধা রতন এই বাণী মূদ্রণ গড়েছিলেন রতন ভাইয়ের বাবা ইউসুফ আলী মৃধা তিনি পাবনার বিখ্যাত বাস মালিকই শুধু ছিলেন নাপ্রকাশনা এবং শিল্পকর্ম চিন্তার দিক থেকে ছিলেন অত্যন্ত গুণী মানুষ সে কারণে তাঁর ছেলে ইয়াসিন আলী মৃধা রতনও কবিতা সংগঠনপ্রকাশনা এবং শেষ পর্যন্ত বিবৃতির মতো একটি সংবাদপত্র প্রকাশের দিকে ঝুঁকেছিলেন

 

শিবজিত দা দায়িত্ব নেওয়ার পর পত্রিকার নতুন অফিস করা হয় ব্যাংক রোডের দোতলায় আগে বাণী মূদ্রণকেই অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হতো নতুন অফিসটি দারুণভাবে জমে উঠেছিল তিনটা রুম ছিল একটা রুমে শিবজিত দা বসতেন আর একটিতে প্রতিবেদকরা বসতেন মাঝের রূমটা ছিল কম্পোজ এবং বিজ্ঞাপন সেকশন

আমাদের কাজের দিনগুলো ছিল অসাধারণ এখানে বলে রাখা দরকারআমরা কিন্তু কেউ বেতনভূক ছিলাম না স্বতঃপ্রণোদিত কর্মী ছিলাম আমরা সম্পাদক শিবজিত দাও বেতন পেতেন নাবা নিতেন না আমরা নিজের শ্রম দিয়ে কাজ করতাম বিনা পয়সায় টুকিটাকি খরচও নিজেদের থেকেই করা হতো প্রকাশক রতন ভাই শুধু অফিস সাজিয়ে-গুছিয়ে দিয়েছিলেন অবশ্য তাঁকে কাগজ-কালি  ছাপার খরচ ঠিকই বহন করতে হতো নিজেদের প্রেসে যেহেতু ছাপাসে কারণে এই খরচটা দৃশ্যত লাগতো না পত্রিকা বিক্রি করেআর বিজ্ঞাপন থেকে যা আয় হতোতা পত্রিকার আনুসঙ্গীক খরচেই লেগে যেতো উপরন্তু ভর্তূকি দিতে হতো রতন ভাইকে এখানে প্রশ্ন উঠতে পারেআমরাই-বা কেন বিনে পয়সায় কাজ করতামআর রতন ভাইই-বা কেন গাঁটের পয়সা খরচ করতে যেতেনএর একটাই জবাবআমরা একটা দর্শন নিয়ে চলতাম মানবসেবা এবং এরজন্য সাংবাদিকতা ছিল আমাদের দর্শন আর সে কারণেই আমরা এভাবে কাজ করতাম

আগে বলেছিআমাদের দিনগুলো ছিল অসাধারণ শিবজিত দা সরকারি চাকরির আগে-পড়ে এসে বসতেন বিবৃতিতে তিনি তখন তুখোর সাংবাদিক আর সম্পাদক হয়ে দেখিয়েছেন আরও মুন্সিয়ানা যা কিনা দেশের বড় বড় পত্রিকাপত্রিকার সম্পাদক এবং গুণী ব্যক্তিত্বরা নানাভাবে প্রকাশ করেছেন আর শুচি সৈয়দসমজিৎ পালমুকুল আহমেদজয়নাল আবেদীনঅমল কান্তি সরকার এবং আমার কাজ ছিল সকাল-বিকাল-রাতে জমিয়ে কাজ করা এটা করতে গিয়ে দারুণ আড্ডা জমতো শিবজিত দা থাকতেন এর মধ্যমনি প্রকাশক রতন ভাই ছিলেন সব কিছুতে উজার করা উৎসাহদাতা ঢাকা থেকে নানান বুদ্ধি-পরামর্শলেখা এবং বিজ্ঞাপন নিয়ে জাহাঙ্গীর আলম মুকুল  শ্যামল দত্ত হাজির হতেন প্রায়ই এই আড্ডাগুলোর কোন তুলনাই হয় না  আড্ডা কোন ধুম-ধারাক্কা আড্ডা বলতে যা বোঝায়তা ছিল না ছিল শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতিসাংবাদিকতাইতিহাসঐতিহ্য আর মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবন নির্ভর ঘটনা নিয়ে শিক্ষামূলক আড্ডা এর মধ্যদিয়েই চলতো লেখালেখি তৈরি হতো পরিকল্পনাদিকনির্দেনা এবং মাঠের কাজের ক্ষেত্র এইসবের মধ্যদিয়ে আমরা সাংবাদিকতায় হয়ে উঠছিলাম দক্ষ থেকে আরও দক্ষ

আড্ডার বাইরেও ছিল মজার মজার নানা কান্ডকারখানা বিবৃতি ছিল আমাদের বাড়িঘর তাই কোনদিন দেখা যেতোরাতে কাজ করতে করতে বাড়িতেই ফিরলো না কেউ কোন রকমে দোকান থেকে কিছু খেয়ে কাঠের চেয়ারগুলো জড়ো করে তার উপর ঘুমিয়ে পড়া হতো প্রচন্ড গরমের দিনে তো সমস্যার কমতি ছিল না কারণ সব ঘরে ফ্যান ছিল না আর ফ্যান থাকলেই-বা কিমশা সম্পর্কে যাদের ধারণা আছেতারা জানেনএগুলো কতো শক্তিশালী দল দেখা যেতো জামা-কাপড় সব খুলে চেয়ারের উপর টানটান হয়ে এক-দুইজন ঘুমিয়ে পড়েছে আর তাদেরকে ঢেকে রেখেছে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মশা মশা দিব্বি রক্ত খেয়ে শরীরেই পড়ে থাকতো বেচারা যারা বেহুঁশের মতো ঘুমাতেনতারা এগুলো খেয়ালই করতেন না সকাল বেলা যখন শুকনো শরীর ফুলে মোটা কিংবা রক্তাক্ত দেখা যেতোতখনই বোঝা যেতো আসল অবস্থা  নিয়ে নানা রকম হাসি ঠাট্টাও জমতো একে-অপরকে নিয়ে আবার বৃষ্টির দিনে দেখা যেতো কেউ ভিজে জবজবে হয়ে কাজে বসে পড়লেন শীতের দিতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে এসে হিটার জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে লাগলেন কিংবা রাতে ছাপা নিউজপ্রিন্ট গায়ে দিয়ে সেগুলোকেই লেপ-কাঁথা বানাতেন। এরকম নানা ঘটনা এতে কারও কোন আক্ষেপ ছিল না ছিল কেবলই উৎসাহ আর উদ্দীপনা আর এই সময় যদি রতন ভাই নিচের ভাজা সিঙারা বা চপ কিনে নিয়ে হাজির হতেনতখন আনন্দের শেষ ছিল না ঝাল-মুড়ির আড্ডা ছিল আরও মজার

এই বিবৃতিতে আমরা খবর লিখতামসে খবর দেখে দিতেন শিবজিত দা তারপর সেই খবর হ্যান্ড কম্পোজ হতো কখনও কখনও বিশেষ কারণে কম্পোজিটর না এলে তখন নিজেরাই বসে একটা একটা করে টাইপ তুলে স্টিকে বসিয়ে কম্পোজ করতে হতো এখানেই শেষ নয় সেই কম্পোজ করা ম্যাটার টাইট করে বেঁধে নিচে নামিয়ে কালি ডলতে হতো রুলার দিয়ে তারপর তার উপর নিউজপ্রিন্ট সেঁটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চাপতে হতো তাতেকরে যে ছাপ বসতোসেগুলোর প্রুফ হিসেবে নিজেদেরই দেখে ঠিক করতে হতো সবকিছু চূড়ান্ত হলে সেই ম্যাটার প্রেসে যেতো প্রেসেও আমাদের দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করতে হতো কাগজের বান্ডিল গোছাতে হতো তখনকার দিনের কাজই ছিল এইরকম একের ভিতর বহুগুণ বলা যায় একে এরপর সবকিছু ঠিক থাকলে ভোর বেলা জয়নাল ভাই বাইসাইকেল নিয়ে বের হতেন পত্রিকা বিলি করতে তিনি একাধারে বিজ্ঞাপন ম্যানেজারসার্কুলেশন ম্যানেজারহকার এবং বিল কালেক্টর আমাদের সবার কাজই ছিল এই রকমের কে যে কী দায়িত্বেরএসব ছিল না সব কাজই ছিল সবার আমরা আবার নতুন গ্রাহক তৈরির জন্য দল বেঁধে মাঠেও নামতাম এতেকরে মানুষ সাড়া দিতেন দারুণভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে পত্রিকার সার্কুলেশন বেড়ে যেতো আমাদের এইসব কাজ দেখে এগিয়ে এসেছিলেন অনেক প্রথিতযমা মানুষ যেমন এসেছিলেন সাংবাদিক আনোয়ারুল হকএডভোকেট রণেশ মৈত্রঅধ্যাপক মনোয়ার হোসেন জাহেদীডারাম দুলাল ভৌমিকঅধ্যাপক আবদুল মান্নান তালুকদারমীর্জা শামসুল ইসলামআবদুল মতীন খানরবিউল ইসলাম রবিসুশীল তরফদারসহ অনেকে পরে কর্মী হিসেবে আরও অনেকেই আড্ডার মহোৎসবে যোগ দিতেন এবং তাঁরাও বিবৃতির পরিবার হয়ে ওঠেন

 

---- চলবে -----


 স্মৃতিকথাসাত

 

রিপোর্টারের

টুকরো

স্মৃতি

আবুল হোসেন খোকন

 

সাত.

আশির দশকের সময়গুলো এখনকার মত ছিল না রিপোর্টিংয়ের জন্য আমাদের পায়ে হেঁটে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার গিয়ে বিটে পৌছাতে হতো পায়ে হাঁটার কারণটা অর্থনৈতিক আমাদের এমন টাকা-পয়সা ছিল নাযা দিয়ে রিকশায় যাবো যদিও রিকশা ভাড়া এখনকার মত ছিল না অফিস থেকে ডিসি অফিসের দূরত্ব আড়াই-তিন কিলোমিটার মত রিকশা ভাড়া চার আনা থেকে আট আনা ছিল মানে এক টাকার চার ভাগের একভাগ বা আধা ভাগ সেটাও আমাদের জন্য খরচ করা বেশ কঠিন ছিল বোঝার জন্য বলছিআমি যখন বিবৃতির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করিতখন বেতন বা সম্মানী ছিল না কিন্তু পরে রতন ভাই একটা টোকেন সম্মানী দেওয়া শুরু করলেন যার পরিমাণ ছিল মাসে দেড়শ টাকা মানে পত্রিকার সম্পাদকের সম্মানী দেড়শ টাকা মাসিক এই দেড়শ টাকাকে দেখতে হবে এখনকার হিসাবে আরও দুই শূন্য যোগ করে অর্থাৎ তার পরিমাণ ১৫ হাজার টাকা সুতরাং রিকশা ভাড়া চারআনা-আটআনাকে কম পয়সা বলা যাবে না

আমরা রিকশায় চড়তাম না আমাদের সম্পাদক শিবজিত দাও রিকশায় চড়ে সাংবাদিকতা করেছেনএমনটি দেখেছি বলে মনে পড়ে না বরং তিনিও দল বেধে হেঁটে হেঁটে আমাদের সঙ্গে যেতেন নিয়মিত রিকশায় চড়তেন কেবলমাত্র আমাদের প্রকাশক ইয়াসিন আলী মৃধা রতন কারণ ওই সময় পাবনার সবচেয়ে প্রভাবশালী বা মান্যগণ্য ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন তিনি মটর মালিক হিসেবে তাঁর নামডাক ছিল উপরের সারীতে এক নামেই তাঁকে চিনতের পাবনার সব মানুষ তাই তাঁর পায়ে হেঁটে চলাটা মানানসই ছিল না

 

যাই হোকআমরা হেঁটে খবর পাওয়ার যায়গাগুলোতে যেতামসেখান থেকে তথ্য-উপাত্ত বা সাক্ষাৎকার নোটবুকে টুকে নিয়ে আসতাম তারপর অফিসে বসে লিখতাম তবে হ্যাঁআমাদের গাড়ি বা মটরসাইকেল না থাকলেও কাজের জন্য দ্রæতযান একটা ছিল সেটা হলো জয়নালের বাইসাইকেল বিবৃতির ওই একটাই বাইসাইকেল সেটা বিজ্ঞাপন সংগ্রহপত্রিকা বিলিবিল কালেকশনের কাজ ছাড়াও খবর সংগ্রহের জন্য আমরা ব্যবহার করতাম

রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য আমরা কখনও একাআবার কখনও দল বেঁধে যেতাম শিবজিত দারতন ভাইও প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যেতেন আর রিপোর্ট বলতে আমরা জনস্বার্থ সংক্রান্ত নানান তথ্য সংগ্রহ করতাম নানা ঘটনার খবর সংগ্রহ করতাম গোপন থাকা অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা জনগণের সামনে প্রকাশ করে দিতাম  ক্ষেত্রে কোনরকম ব্লাকমেইল বা স্বার্থ হাসিলের চিন্তা আমাদের ছিল না এমন কাজকে আমরা সাংবাদিকতার নীতি এবং আমাদের নৈতিক আদর্শের পুরো পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করতাম যদিও শেষ পর্যন্ত এরকম নৈতিকতা পাবনায় শতভাগ টিকে থাকেনি আশির দশকের মাঝামাঝির দিক থেকে সামরিক শাসক এরশাদ তার হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য সাংবাদিকদের নষ্ট করে দিতে থাকেন নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দেন লোভ-লালসায় ফেলে কারও কারও নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করেন তবে এর শিকার খুব কমজনই হয়েছেন কারণ তখন নৈতিকতার শক্তিরই প্রাধান্য ছিল

আমাদের এই সময়টাতে সাংবাদিকদের যে কী মর্যাদা ছিলতা এখন কল্পনাও করা যায় না মানুষ দেশের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী বা ডিসি-এসপিকে যতোটা না গুরুত্ব দিয়েছেনতার চেয়ে অনেক বেশি সাংবাদিকদের মর্যাদা  সম্মান দিয়েছেন

 

 সময় আমরা অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টিংয়ের জন্য নানান পন্থা অবলম্বন করেছি একবার শুচি সৈয়দ আর আমি অফিস থেকে ছুটলাম সিঙ্গা গ্রামের অনেক ভেতরের দিকে আমরা অফিসে বসে একটা হিসাব-নিকাশ করেছিলাম তখন পাবনার উপর দিয়ে আন্তঃনগর ৩৩ হাজার ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কোথা থেকে যেন খবর পেয়েছিলাম যেবিদেশিদের অর্থে নির্মিত এই লাইন স্থাপনে বড় রকমের দুর্নীতি করা হয়েছে শহরের দিকে লাইনের উচ্চতা যে পরিমাণ করা হয়েছিলগ্রামের দিকে গিয়ে সেই লাইনে একটা করে ধাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এতেকরে উচ্চতা কমে গেছেএবং এক-একটি ধাপ বাবদ লাখ লাখ টাকা লোপাট হয়েছে এই তথ্যটা সরেজমিনে কীভাবে যাচাই করা যায়তারই একটা হিসাব তৈরি করেছিলাম আমাদের কাছে প্রশ্ন ছিললাইনে ধাপ কম বসানো হয়েছেতা প্রমাণ করবো কীভাবেলাইন দেখে তো তা বোঝা যাব না সুতরাং উচ্চতা মাপতে হবে সেটা কীভাবে সম্ভব৩৩ হাজার ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইনের উচ্চতা মাপার চিন্তা পাগলামো ছাড়া কিছু নয় কারণ বেশ কিছুদিন আগে শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়া লাইনের নিচে কাজ করছিলেন বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মী হঠাৎই তিনি ১১ হাজার ভোল্টেজের প্রভাবে নিমেষেই পুড়ে ছাই হয়ে যান কয়লার গুড়ো ছাড়া তার শরীরের আর কিছু পাওয়া যায়নি এডওয়ার্ড কলেজ গেটের সামনে এঘটনা ঘটেছিল সুতরাং অভিজ্ঞ বিদ্যুৎ অফিসের লোকেরই যখন ১১ হাজার ভোল্টেজে এই দশা হয়েছেতখন ৩৩ হাজারে আরও কী না হতে পারে!

তাই বলে আমরা হাল ছাড়িনি বইপত্র পড়ে বিদ্যুৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলাম তারপর আমরা পরিকল্পনামত শহর থেকে হেঁটে অন্তত ১২/১৪ কিলোমিটার দূরে সিঙ্গা এলাকায় খোলা মাঠের ধান ক্ষেতের মধ্যে চলে যাই  সেখানে কোন জনবসতি ছিল না আমাদের দুটি পন্থা গ্রহণ করা ছিল এক হচ্ছেশুকনো মোটা সুতো নিয়েছিলাম সেটার মাথায় ইটের দলা বেঁধে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের উপর ছুঁড়ে দিয়েছি অতো উপরে সহজেই এটা করা যায়নি অনেকবার চেষ্টার পর বিদ্যুৎ লাইনের উপর দিয়ে সেটা পাঠাতে পেরেছিলাম তারপর সুতো ঢিল দিয়ে ইটের দলাকে নিচে নামিয়েছিলাম জ্ঞান অর্জন থেকে জানতাম শুকনো সুতোয় বিদ্যুৎ প্রবাহের ভয় নেই তারপরেও ৩৩ হাজার ভোল্টেজ বলে কথা নানাভাবে পরীক্ষা করে যখন নিশ্চিত হয়েছিতখনই সেই সুতোকে হাত ধরেছি এভাবে সুতো দিয়ে লাইনের উচ্চতা মেপেছি আরেকটি পন্থা ছিলসূর্য্যরে আলোতে মাটিতে পড়া বিদ্যুৎ থাম্বার ছায়া মাপা আমরা পড়াশুনা করে একটা হিসাব বের করেছিলাম সেইমত থাম্বার মাপ নিচ্ছিলাম দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় নয়প্রয়োজনীয় কয়েক জায়গায় গিয়ে একইভাবে মাপগুলো নেওয়া হয় কাজটি যেমন ছিল দুঃসাহসিকতেমন ছিল বেশ পাগলামিপূর্ণ

 

এই বিদ্যুৎ লাইন নিয়ে এর আগে আরেকটি অভিযান চালানো হয়েছিল সম্পাদক শিবজিত নাগশ্যামল দত্তশুচি সৈয়দমুকুল আহমেদমোস্তাফা আরব সতেজঅমল সরকারআমিসহ বেশ কয়েকজন গিয়েছিলাম শহর থেকে দূরে আতাইকুলায় সেখান থেকে এই বিদ্যুৎ লাইন সম্পর্কে খোঁজ নিতে আরও দূরে একেবারে গ্রামের ভেতর চলে যাই কারণ তখন সবেমাত্র এই ৩৩ হাজার ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন চালু করা হচ্ছে  নিয়ে নানা রকম কথাও কানে এসেছে সেসব যাচাই করতেই আতাইকুলা যাওয়া

আমরা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করলামওই