কাল্পনিক দৃশ্য
স্মৃতির জানালা : আট
একাত্তরের ২৯ মার্চ। মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রথমেই পুলিশ লাইনে হামলা চালায়। পুলিশরাও প্রস্তুত ছিল। তাদের সঙ্গে যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত ছিল সাধারণ মানুষহ মুক্তিযোদ্ধারা। পুলিশ বাহিনী পুলিশ লাইনের ভেতরে ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা আশপাশের সব জায়গায় অবস্থান করছিল। ফলে মেশিনগান সজ্জিত পাকিস্তানি হানাদাররা পুলিশ লাইনে চড়াও হয়েই ফাঁদে পড়ে যায়। তারা ক্ষুণাক্ষরেও চারদিকে থেকে ঘেরাও হয়ে যাবার বিষয়টি বুঝতে পারেনি। ফলে তারা পুলিশ লাইনের সামনে এসে গুলি বর্ষণ করতেই আশপাশের প্রায় সব ভবনের ছাদ থেকে তাদের উপর মুক্তিযোদ্ধাদের টুটুবোর রাইফেল, একনালা-দোনালা বন্দুক গর্জে ওঠে এবং বর্ষণ হতে থাকে বিষ মেশানো তীর ও হাতে বানানো বোমা। পুলিশও মিলিটারির উপর পাল্টা জবাব দিতে থাকে। এমন অবস্থায় খুব দ্রুতই পাকিস্তানি বাহিনীর শৃঙ্খলা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। তারা রণাঙ্গন ছাড়তে থাকে, দল বেধে পালাতে শুরু করে। এ রকম একটা দল দৌঁড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় কিছু দূরের টেলিগ্রাফ অফিসে। সেখানে আগে থেকেই কিছু সেনা ছিল। পলাতকরা তাদের সঙ্গে যোগ হয়। বাকি সেনারা কোন রকমে বিসিক শিল্প নগরীর মূল অবস্থানের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা তখন কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে একটি দল টেলিগ্রাফ অফিস দখলের অভিযানে নামে। বাকিরা বিসিক এবং বালিয়াহালটের ওয়াপদা ভবনে থাকা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য চলে যায়।
আমাদের সময় কাটছিল টান টান উত্তেজনার মধ্যে। দ্বিতীয় প্রহরে গুলির শব্দে আকাশ-বাতাশ কাঁপছিল। আকাশে দেখা যাচ্ছিল ঝাঁক ঝাঁক গুলির সঙ্গে আগুনের শিখা। কান পাতা দায় হয়ে উঠেছিল। আমরা বাড়ির সবাই কখনও ঘরের ভিতর খনন করা পরীখায়, কখনও বাইরে এসে গলা বাড়িয়ে দৃশ্য দেখছিলাম। তবে কী ঘটছে বুঝতে পারছিলাম না। আশপাশের কেউ কিছুই বলতে পারছিল না। তখন বাবা বাড়ি থেকে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। শরীফের বাবা এবং কয়েসের বাবার সঙ্গে কথা বললেন। সবাই পালিয়ে যেতে একমত হলেন।
ভোর হওয়ার বেশ আগে গুলির শব্দ আরও জোরদার হলো। আকাশ ঝলকাতে থাকলো। তখন বাড়ির দরজায় তালা মেরে বাবা আমাদের নিয়ে শরীফ-রুমদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হলেন। তারপর ছুটলেন উত্তরের সিঙ্গা গ্রামের দিকে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে তখন ঝাঁকে ঝাঁকে মেশিনগানের গুলি ছুটে যাচ্ছিল।
সবার মধ্যে ভয় আর আতঙ্ক ভর করলেও, আমার মধ্যে এসব ছিল না। বরং এমন ঘটনা উল্লসিত করছিল। অবশ্য কাওকে সেটা বুঝতে দিচ্ছিলাম না। সে সুযোগও ছিল না। কারণ অন্ধকার রাতের এই ছুটে চলায় যোগ হয়েছিল শত শত পরিবার। পড়িমড়ি করে সবাই ছুটছিল গ্রামের দিকে। কান্না, আহাজারি, চলতে গিয়ে কাঁচা রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়া, পেছন থেকে আরও জোরে ছুটে চলার নির্দেশ- সব মিলিয়ে অন্যরকম পরিস্থিতি। এর মধ্যেই বড়দের ধমকানিতে মরিয়া হয়ে ছুটতে হচ্ছিল। [এর কিছু বর্ণনা আমার প্রথম গ্রন্থ ”ঘাতকের পদতলে বসবাস” এবং পরবর্তী ”জনযুদ্ধের দিনগুলি” তে উল্লেখ করা হয়েছে]
আমরা পালিয়ে সিঙ্গা গ্রামে বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে ঠাঁই নিলাম। যেহেতু বাবার বন্ধুরা সব পাকিস্তানপন্থী, তাই তাদের মতামত অনুযায়ী, যুদ্ধ থামবে না। যুদ্ধ আরও ভয়াবহ হবে। এসব ভেবে বাবাসহ শরীফ-রুমের অভিভাবকরা আরও প্রত্যন্ত এলাকায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এইদিনই গরুর গাড়ি ভাড়া করা হলো।
স্বাধীন পাবনা : ২৯ মার্চ হানাদারমুক্ত হয় পাবনা। বিকেলের মধ্যে বিসিক শিল্পনগরী, ওয়াপদা, ময়লাগাঢ়সহ সব পাকিস্তানি ঘাঁটির পতন ঘটে। দুপুরের আগেই টেলিগ্রাফ অফিস হানাদার মুক্ত করা হয়। এসময় এখানে অন্তত ২৮ জন পাকিস্তানি সেনা খতম হয়। যদিও কয়েকজন সাদা পোশাকে জনতার সঙ্গে মিশে পালিয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য তারা ধরাও পড়েছিল। পাবনার এই স্বাধীনতা ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বহাল ছিল। [চলবে]




0 মন্তব্যসমূহ