Header Ads Widget

Responsive Advertisement

স্মৃতির জানালা : পাঁচ

 

স্মৃতির জানালা : পাঁচ

আবুল হোসেন খোকন

বাড়ি থেকে এডওয়ার্ড কলেজ একেবারে কাছে। গেট থেকে রাস্তা, তারপর রথঘর মোড় পাড় হয়ে বটতলা বা গোলা। এর বামেই এডওয়ার্ড কলেজে প্রবেশের প্রধান পথ। ৬৯-৭০ সালের কথা। এসময় আন্দোলনে উত্তাল ছিল দেশ। এডওয়ার্ড কলেজের ঐতিহাসিক বটতলা ছিল আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার প্রাণকেন্দ্র।

বেশিরভাগ সময়ই কলেজের ভেতর দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করা হতো। তখন বটতলার ঝাঁঝালো মিটিং আর বক্তৃতা হা করে দাঁড়িয়ে শুনতাম। ছাত্র সংগঠনের নেতারা হাত উঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিতেন। বক্তৃতা শেষ হলে জঙ্গি মিছিল নিয়ে ছুটতেন শহরের দিকে।

এডওয়ার্ড কলেজকে কেন্দ্র করে রাধানগর, মজুমদার পাড়া এবং পৈলানপুর অঞ্চল ছিল নকশাল অধ্যুষিত এলাকা। তাঁদের দাপটে অন্য কোন দল খুব একটা সুবিধা করতে পারতো না। নকশালদের এতো দাপটের কারণও ছিল। এক সময় নকশাল বাড়ি আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা চারু মজুমদার এডওয়ার্ড কলেজে পড়শুনা করেছেন। তিনি এখন থেকেই তাঁর রাজনীতির কাজ করেছেন এবং চারদিকে সাংগঠনিক শক্তিও তৈরি করেছেন। ফলে নকশাল রাজনীতির দাপুটে প্রভাব তৈরি হয়েছিল। বলা যায় এই এলাকার বেশিরভাগ তরুণ-যুবকই নকশাল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এডওয়ার্ড কলেজের ভেতর একটা ব্যায়ামাগার ছিল। নকশাল নেতাদের অনেকেই এই ব্যয়ামাগারে ব্যায়াম করতেন। তাঁদের কেউ কেউ বডিবিল্ডার হিসেবে সবার চোখে পড়তেন। বিশেষভাবে নজর কাড়তেন নকশাল নেতা শহীদ মাসুদ। টিপু বিশ্বাস ছিলেন তাঁদেরও নেতা। এডওয়ার্ড কলেজে নকশালদের রাজনীতি চলতো ছাত্র ইউনিয়ন-এর ব্যানারে। ছাত্র ইউনিয়নে তখন দুটি ভাগ ছিল। একভাগকে মেনন গ্রুপ বলা হতো, আরেক ভাগকে মতিয়া গ্রুপ বলা হতো। এখানে মতিয়া গ্রুপের প্রভাব ছিল না। এডওয়ার্ড কলেজের দখল ছিল মেনন গ্রুপের হাতে। আমার যতোটুকু মনে পড়ে এবং বড় হবার হবার পর যা জেনেছি, তা হলো- এডওয়ার্ড কলেজে যাঁরা নকশাল বা মেনন গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, কলেজের বাইরে তাঁরা টিপু বিশ্বাসের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) নামে কাজ করতেন। কলেজের পেছন দিকে, অর্থাৎ আমাদের বাড়ি থেকে আরও কাছে একটা কালিবাড়ি ছিল, ঠিক তার পাশেই ছিল নকশালদের একটি অফিস ঘর। সাইরবোর্ডে লেখা ছিল, ছাত্র ইউনিয়ন অফিস। এই অফিসের সামনে রাস্তার পাশে ছিল তিনদিক খোলা একটা বড় সাইজের দোকানমত জায়গা। এখানে প্রতিদিন লাল টুপি মাথায় দিয়ে টিপু বিশ্বাস মিটিং করতেন। তাঁর সামনে বসে থাকতেন ১৫/২০ জন লাল টুপি মাথায় দেওয়া তরুণ-যুবক। টিপু বিশ্বাস গলা চড়িয়ে আঙ্গুল নাচিয়ে বক্তৃতা করতেন। অনেক দূর থেকেও তাঁর গলা শোনা যেতো। আমি রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের সময় বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে এসব দেখতাম।

২০১২ খ্রিস্টাব্দে আমার চতুর্থ গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল নাম, জনযুদ্ধের দিনগুলি। সেই বইতে এই নকশালদের বিষয় নিয়ে লেখা রয়েছে। সেই বইয়ের অংশ বিশেষ-


 আমি ছাত্র ইউনিয়ন এবং ভাসানী ন্যাপের (পরে নকশাল) অবস্থানে বাস করে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ সমর্থক হলেও ছাত্র ইউনিয়ন-ভাসানী ন্যাপের সভায়ও অংশ নিতাম। তাদের রাজনৈতিক কথা বুঝতাম না। কিন্তু এটুকু বুঝতামÑ টিপু বিশ্বাস তাদের নেতা। আমাদের পাড়ার কালিবাড়ি মাঠ এবং সামনের একটি দোকানে ওদের সভা অনুষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। মনযোগ দিয়ে ওদের পোস্টার লেখা দেখতাম। ওরা রাস্তায় রাস্তায় দেয়াল লিখন লেখার সময়ও লক্ষ্য করতাম। দেখে দেখে লেখা শিখতাম।

এই সময় টিপু বিশ্বাসের পরের নেতা ছিলেন মাসুদ, শহীদ, তোতা নামে কয়েকজন ব্যায়ামবীর। অন্যদিকে ছাত্রলীগের তুখোর নেতা ছিলেন আবদুস সাত্তার লালু। তার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের মিছিল যখন আমাদের এলাকায় ঢুকতো তখন তারা সব রকম লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে আসতো। আর ছাত্র ইউনিয়নেরও অবস্থান থাকতো পাল্টাপাল্টি।

এই সময় একটা বিষয় লক্ষ্য করছিলাম। ছাত্র ইউনিয়ন এবং ভাসানী ন্যাপের পাশাপাশি পূর্ব বাঙলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) নামে দেওয়াল লিখন শোভা পেতে শুরু করে। এই লিখন লিখছিল ওই ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপের লোকেরাই। আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলাম ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরাই পূর্ব বাঙলার কমিউনিস্ট পার্টির লোক এবং এরাই নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত।

৭০ সালের কথা। প্রতিদিন স্কুলে মিছিল ঢুকতো। কোনদিন ছাত্রলীগ, কোনদিন ছাত্র ইউনিয়ন। মিছিল এসেই ক্লাস ভেঙে দিতো এবং সব ছাত্রকে মিছিলে নিয়ে যেতো। আমরাও ক্লাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে মহানন্দে মিছিলে সামীল হতাম। চিৎকার করে সবার সঙ্গে  স্লোগান দিতাম, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা দফা ১১ দফা, মানতে হবে মানতে হবেজয় বাংলা তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিবতোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে স্লোগান দিতাম, ভোটের বাক্সে লাথি মার, পূর্ব বাঙলা স্বাধীন করোজয় সর্বহারাটিপু বিশ্বাসসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি চাই মুসলিম লীগের মিছিল দেখেছি, কিন্তু তাতে কখনও যাইনি। ওরা স্কুলে আসতো না। রাস্তা দিয়ে মিছিল করে চলে যেতো। তবে ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রলীগের মিছিলে যতো মানুষ হতোÑ তা কল্পনাকেও হার মানাবার মতো। মিছিলের মাথা থেকে লেজ খুঁজে পাওয়া যেতো না। -তো মাইল লম্বা মিছিল যে হতো ভাবাও যায় না। আর এই মিছিলে মানুষ যোগ দিতো দোকানপাট বন্ধ করে, অফিস-প্রতিষ্ঠিান গুটিয়ে রেখে। -তো মানুষের স্লোগানে আকাশ-বাতাস বিস্ফোরণের মত কাঁপা শুরু করতো।

একদিন আমাদের মিছিলের স্রোত যাচ্ছিল জেলখানার পাশ দিয়ে। তখন জেলখানাকে পশ্চিমে রেখে পূব দিকে ছিল একটি গোডাউন। ওই গোডাউনের কাছে গেলে জেলখানার দ্বিতীয়তলার জানালা দেখা যেতো। সেদিন ওই জানালা দিয়ে রাজনৈতিক নেতা টিপু বিশ্বাসসহ কয়েকজন দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। আর মিছিলের নেতারা ওই গোডাউনের সামনে দাঁড়িয়ে হাত ঊঁচিয়ে জবাব দিচ্ছিলেন। এসময় মিছিল থেকে  স্লোগান উঠছিল, টিপু বিশ্বাসের মুক্তি চাই মতিয়া চৌধুরীর মুক্তি চাইশেখ মুজিবের মুক্তি চাইসকল রাজবন্দির মুক্তি চাইজ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো

আরও একদিনের মিছিল। একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে। মিছিল থেকে শহরের সব ইংরেজি লেখা সাইনবোর্ড ভাঙা হয়। হাজার হাজার মানুষ মিছিল থেকে এক একটি দোকান-প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের ওপর লাঠি-সোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন। অনেকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ওগুলো গুড়িয়ে দিচ্ছিলেন। মহাউৎসাহে চলছিল এসব। তবে কোন দোকান-প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করা হচ্ছিল না, শুধু সাইনবোর্ডই ভাঙা হচ্ছিল।

রকম সময়ে জাতীয় সঙ্গীত নিয়েও প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়। আমরা স্কুলে গাইতাম, পাক সার জমিন সাদ বাদ, কিশওয়ারে হাশিন সাদ বাদ, তু নিশানে আজমে আলীশান, আজমে পাকিস্তান... কিন্তু তখন আমরাও গাইবো না গাইবো না বলে প্রতিবাদ জানানো শুরু করেছিলাম। পতাকা উত্তোলনের সময় হয় চুপ করে থাকতাম, অথবা গালি দিয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলতাম।

এরমধ্যে কয়েকটি সঙ্গীতকে বিকল্প জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া শুরু হয়ে যায়। এর একটি ছিল, পূরব বাংলা শ্যামলী ময়... তবে ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা, আমার দেশ বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা, সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা.... সঙ্গীতটি বিকল্প জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বেশি গাওয়া হয়।

এই সময়টাতে ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক ছিল। আমরা অবশ্য তখনও সেটা ভাল করে বুঝিনি। শুধু অনুমান করতে শুরু করিÑ একদিন স্কুলে ছাত্রলীগের রণপ্রস্তুতি দেখে। খবর এসেছিল ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল আসবে স্কুলে। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগ সমর্থকরা স্কুলে লাঠি-সোটা জড়ো করতে থাকে। প্রস্তুতি নেয়া হয় ছাত্র ইউনিয়নকে রুখে দিতে। আমরা টানটান উত্তেজনায় পড়ে যাই। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল স্কুলে আসেনি। মারপিটও হয়নি। এইদিন থেকে আমি মনে মনে ছাত্রলীগের সমর্থক হয়ে গিয়েছিলাম।

ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের বিরোধ এক পর্যায়ে বড় রকমের সংঘাতে রূপ নিয়েছিল। আর রাজনৈতিকভাবে এর বিস্তৃতি ঘটেছিল আওয়ামী লীগ এবং ভাসানী ন্যাপের মধ্যে। ভাসানী ন্যাপ ছ্ত্রা ইউনিয়নের ঘাঁটি ছিল আমাদের রাধানগর গ্রাম এবং এডওয়ার্ড কলেজ এলাকায়। আর ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল অন্য সব জায়গায়।

(চলবে)

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ