Header Ads Widget

Responsive Advertisement

স্মৃতির জানালা : দশ

 

    কাল্পনিক দৃশ্য

 

স্মৃতির জানালা : দশ

আবুল হোসেন খোকন
 

এপ্রিল ১৯৭১। খবর এলো নগরবাড়ি ঘাটের পতন ঘটেছে। পাকিস্তানি বাহিনী অনেকগুলো গানবোট নিয়ে  গোলা ছুঁড়তে ছুঁড়তে অগ্রসর হচ্ছিল। আকাশের বিমান থেকে অনবরত বোমা গোলা বর্ষণ হচ্ছিল। দুটো বিমান নিরবচ্ছিন্নভাবে মেশিনগান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিখার উপর বৃষ্টির মত গুলি চালিয়েছে। পরিখা বা কোন আড়াল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা মুহূর্তের জন্যও বের হতে পারেনি। অবস্থায় নগরবাড়ি ঘাট পাক হানাদার বাহিনীর দখলে চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা যখন দেখতে পেলো- হানাদার বাহিনী পৌঁছে গেছে, তখন তারা রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। নগরবাড়ি দখলের পর পাবনা আসার পথে মিলিটারিরা মর্টার কামানের গোলা বর্ষণ করে ব্যারিকেডগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে।

নগরবাড়ি দখলের পর গভীর রাতে মিলিটারিরা পাবনায় ঢোকে। আমরা আগেই বাড়ি ছেড়েছি। এসেছি পশ্চিম দিকের জলিল কন্ট্রাকটর চাচার বাড়ি। বোমা গোলার আঘাত থেকে বাঁচার জন্য এই বিশাল পাকা বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। জলিল কন্ট্রাকটর আমাদের উপর এবং পাশের হাকিম চাচার উপর বাড়ির দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন। হাকিম চাচা বাড়িতে থাকেন না, নিজের বাড়িতেই পাহারা দেয়ায় ব্যস্ত থাকেন। তবে তিনি এখানে খোঁজ খবর রাখছিলেন।

পাবনা দখলের আগে মিলিটারিরা রাতের বেলা একরকম আগুনের গোলা ছুঁড়ছিল। দেখছিলাম, রাইফেলের গুলি' শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আকাশে একটি আগুনের পিন্ড উঠে যায়, তারপর লেজের মত হয়ে আকাশে ঝুলতে থাকে। এর নাম নাকি ট্রেসার বুলেট। ওটা দিয়ে মিলিটারিদের আগমন সংকেত দেয়া হয়। আগুনের পিন্ড দেখে অন্ধকার রাতে প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম।

 *************

নগরবাড়ি পতনের পরের সকাল। খবর পাওয়া গেলো, হামিদ সড়ক দিয়ে ভোর রাতের দিকে সারি সারি মিলিটারি ট্রাক রাজশাহী/ঈশ্বরদী' পথে গেছে। বাঙালিদের দেখে নাকি ওরাটা টা দিয়েছে। ফজরের নামাজ পড়তে উঠে অনেকেই এসব দৃশ্য দেখেছে।

আরও কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পাওয়া গেলো, পাবনা শহর মিলিটারিতে ভরে গেছে। ওরা সড়ক পথে যাকে পাচ্ছে তাকেই গুলি করে হত্যা করছে। বাঙালিদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। সময় শহরের দিক থেকে গুলির শব্দসহ বিভিন্ন ধরনের শব্দ শোনা গেল। আরও অল্পক্ষণের মধ্যেই আকাশে বিকট কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী চোখে পড়লো।

তখন সকাল নয়টা। শহরের দিক থেকে বিকট শব্দগুলো ক্রমেই আমাদের এলাকার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। আগুন আর ধোঁয়ার কুন্ডলী চারদিকে অন্ধকার করে দিতে শুরু করল। বাবা এবং হাকিম চাচা বলতে পারছেন না কী করবেন। বাইরে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন। মিলিটারিরা নাকি সবদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। যে কোন মুহূর্তে সামনে পড়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। পালিয়ে যাবারও এখন কোন উপায় নেই।

এবার আমাদের পাড়ায়ও বিস্ফোরণের শব্দ হলো। ধোয়াঁর কুন্ডলী চোখে পড়লো। বাবা পাজামা, পাঞ্জাবী আর টুপি পরে খোঁজ নিতে বের হলেন। কিন্তু ফিরে এলেন তখনই। কাঠের মোটা দন্ড দিয়ে বাড়ির গেট শক্ত করে এঁটে দিলেন। রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সবাইকে কলেমা পড়তে বললেন। হাতে একটি তরবারি নিয়ে বললেন, ‘বাইরে আগুন। কিছু দেখা যায় না। মনে হল মিলিটারি রয়েছে।

হঠাৎ গেটের দরজায় প্রচন্ড লাথির আওয়াজ হতে লাগলো। বাবা রুমের দরজা আরও শক্ত করে এঁটে দিলেন। বাইরে উর্দুতে হুংকার শোনা যাচ্ছে। দরজা ভাঙার শব্দ হলো। তারপর দরজা হয়তো ভেঙ্গে গেলো। এবার শব্দ হল আমাদের রুমের দরজায়। খোল শালে গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে দরজায় লাথি পড়ছে। বিহারী ফরহাদের বাবা আশরাফ খানের কণ্ঠ শোনা গেলো। তিনি বোধ হয় দরজা খুলতে বলছেন। বাবা এগিয়ে গেলেন এবং দরজা খুলে দিলেন। হুড়মুড় করে তিন-চারজন জঙ্গী মিলিটারি ভিতরে ঢুকে পড়লো, পিছনে আশরাফ খান। মিলিটারিদের হাতে উদ্দত চকচকে টমিগান এবং তার মাথায় বিরাট ঝকঝকে বেয়নেট। উর্দুতে খিস্তি করে উঠল ওরা। তারপর  বেয়নেট নাচিয়ে লাইন হয়ে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করলো সবাইকে। আমরা নির্দেশ পালন করলাম এবং কলেমা পড়তে লাগলাম।

সবাই এক লাইনে দাঁড়িয়েছি। সামনে টমিগান উঁচিয়ে একজন মিলিটারি গুলি করার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। অন্যরা ঘরে তল্লাশ শুরু করলো। আশরাফ খানের সঙ্গে বাবার কি যেন ইঙ্গিত বিনিময় হলো। আশরাফ খান মিলিটারিদের বললেন, ‘ইয়ে আওয়ামী লীগ নেহি হ্যায়, ইয়ে হামারা দোস্ত হ্যায়, জামায়াতে ইসলামী হ্যায়। মিলিটারিরা নাছোড় বান্দা। কিছুই শুনতে চাইছে না। দরজা না খোলার জন্য দারুণ ক্ষিপ্ত হয়েছে। আশরাফ খান আবার ওদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। এক সময় অফিসার মত একজন মিলিটারি এগিয়ে এসে আমাদের বলল, ঠিক হ্যায়, কলমা পড়ো। নির্দেশ মত বাবা কলেমা পড়লেন, হাকিম চাচা পড়লেন, বড়রা সবাই পড়লো। একে একে সবার কলেমা শুনলো সে। তবে ছোট বলে আমাকে এবং ভাই বোনগুলোকে কিছু জিজ্ঞেস করলো না। তারপর এক সময় মিলিটারিরা সন্তুষ্ট হলো এবং চলে গেলো। আশরাফ খান বলে গেলেন, ‘কোন ভয় নেই।

আরও কিছু সময় পর। এবার চারপাশে আগুনের অসংখ্য শিখা চোখে পড়লো। খুব ধোঁয়া হচ্ছে আর ফটাফট শব্দে বাঁশ ফাঁটছে। মিলিটারিরা আশে পাশের কাঁচা বাড়িগুলোতে আগুন দিয়েছে। প্রায় সব বাড়িতেই বাঁশ ঝাঁড় ছিলো। আগুনের কারণে সেগুলো শব্দ করে ফাটছে।

হাকিম চাচা নিজের বাড়ি দেখার জন্য সাবধানে বেরিয়ে গেলেন। তার বাড়িও কাঁচা, আমাদের বাড়িও আধা কাঁচা। বাবা শংকিত হয়ে উঠলেন। এত বিরাট বাড়িটি জ্বালিয়ে দেয়া হলো কিনা- সে জন্য চিন্তায় পড়েছেন। আমাকে বললেন, ‘তুই না হয় ঘুরে দেখে আয়। একেবারে ছোট আছিস বলে তোকে মিলিটারিরা কিছু বলবে না। তিনি উঁকি দিয়ে রাস্তাঘাট দেখলেন। বললেন, ‘কোন মিলিটারি দেখছি না। যা, তুই বাড়িটা দেখে আয়। জয় বাংলার পতাকা থাকলে ফেলে দিয়ে আসিস।

নির্দেশ মত রওনা হলাম বাড়ির পথে। জলিল চাচার এই বাড়ি থেকে পূব দিকে যেতেই রাস্তার উপর টিউবওয়েল, তারপর বাঁ পাশে বীরেণ ডাক্তারের বাড়ি, জানে মহিদুল ভাইদের বাড়ি, আরেকটু পরে বিহারী আশরাফ খানের বাড়ি। আমাদের বাড়ি পর্যন্ত যেতে দুপাশ জুড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস। সবগুলো বাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলছে। এসব যে হিন্দুদের বাড়ি- তা কী করে টের পেলো মিলিটারিরা? বাড়িতে ঠাকুর ছিল বলেই কি? নাকি বিহারী আর জামায়াত-মুসলিম লীগের লোকেরা মিলিটারিদেরকে এসব বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছে? শুধু হিন্দু নয়, যেসব মুসলমান বাড়ির লোকজন আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতো, তাদের বাড়ি-ঘরও জ্বলছে।

বীরেণ ডাক্তারের বাড়ি দেখে বেশি কষ্ট লাগলো। ওই বাড়িতে খুব যেতাম। বাড়িতে ডাক্তার বাবু একটা ময়না পাখি ছিল। আমরা গেলে সে ময়না কথা বলতো। ডাক্তার বাবু ডাক্তার বাবু বলে চিৎকার জুড়ে দিতো। আমরা বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে ডাক্তার বাবুর ওই ময়না পাখি দেখতে যেতাম। বাড়িটায় যেভাবে আগুন লেগেছে, তাতে ওই ময়নার বাঁচার কথা তো নয়-ই। ময়নাটিকে কি কেউ নিয়ে গেছে? এগিয়ে গিয়ে দেখার চিন্তা করলাম। কিন্তু আগুনের প্রচন্ডতায় এগিয়ে যাবার কোন উপায় নেই।

সুতরাং সামনে এগিয়ে চললাম। ফাঁকা রাস্তা। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি যেতেই কেমন যেনো নিজেরে ভেতরে শিউরে উঠতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, মিলিটিারির হাতে পড়ে যাবো। দ্রুত পা চালিয়ে মোড়ে পৌঁছুতেই আশংকা সত্যে পরিণত হল। তিনজন দশাসই মিলিটারি চকচকে টমিগান হাতে আসছিল। আমাকে দেখে ওরা উৎসুক হয়ে উঠলো। বললো, ইধার আও বাচ্চে। ভয়ে এগিয়ে গেলাম। তবে ওরা আমার মাথায় এবং মুখে হাত বুলিয়ে দিলো। বলল, বাচ্চে, তুমহারা নাম কিয়া হায়?' আমি আমার পুরো নাম বললাম। সঙ্গেমোহাম্মদ শব্দটি লাগিয়ে দিলাম। বাবা বারবার করে কথাটি শিখিয়ে রেখেছেন। ওরা বলল, তুম মুসলমান হ্যায়? আমি মাথা নাড়লাম। ওদের একজন খাঁকি প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে এক মুঠো চকলেট বের করলো। আমাকে দিলো। হাফ প্যান্টের দুই পকেট এবং দুই হাত ভর্তি করে ওগুলো নিলাম। এবার ওরা আমার দিকে ঝুঁকে বললো, 'ইঁধার জুঁ বাংলা কাঁহা হ্যায়? প্রথমে ওদের কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। আবার বলল, জু বাংলা, আউর হিন্দু কাহা হ্যায়' এবার কিছুটা বুঝলাম। আমার দুধারেই হিন্দুদের বাড়ি। কোনো কোনো বাড়িতে এখনও হিন্দু পরিবার রয়েছে বলে জানি। ভাবলাম, হিন্দু বাড়িগুলো হয়তো জ্বালিয়ে দেবে, কিংবা পরিবারগুলোকে গুলি করে হত্যা করবে। খুব ভয় পেলাম। ওরা আবার বলল, বাতাও, হিন্দুকা ঘাঁর কাঁহা?আমি চট করে বুড়ি বাড়ি দেখিয়ে দিলাম। কারণ, জানি ওই বাড়িতে বুড়িরা কেউ নেই। মিলিটারিরা খুব খুশি হলো। আমার দুগালে টোকা মেরে বললো, ‘ছাস বাতাইয়ে, ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায়।

ওরা বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেলো। আমি পেছন থেকে সটকে পড়ার তালে রইলাম। এই ফাঁকে দেখলাম, আমাদের বাড়িতে আগুন লাগেনি, সব ঠিক আছে। মিলিটারিরা চোখের আড়াল হতেই, লম্বা পা ফেলে জলিল চাচার বাড়ি দিকে ছুটলাম।

বাড়িতে পৌঁছে বাবাকে সব জানালাম। চকলেটগুলো ভাইবোনদের দিলাম। আরও পরে হাকিম চাচা এলেন। বললেন, গোটা রাধানগরে আওয়ামী লীগ আর হিন্দুদের বাড়িগুলো জ্বলছে। মিলিটারিরা অনেক মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে। তিনি বললেন, কিছুক্ষণ আগে মিলিটারিরা পাড়া ত্যাগ করেছে।

ঘর থেকে বাইরে উঁকি দিতেই দেখা গেলো, চারদিকে শুধু কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী। ধোঁয়া থেকে আগুনের লালাভ হলুদ শিখাগুলো দানবের জিহ্বার মত লক লক করছে। আগুন আমাদের বিল্ডিংকেও গ্রাস করবে কিনা কে জানে! হাকিম চাচা বললেন, কাঁচা বাড়িঘরগুলোতে মিলিটারিরা কিছু একটা ছিটিয়ে দিয়েছে, তারপর দিয়াশলায়  জ্বেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে গোটা বাড়িঘরগুলোতে আগুন ধরে গেছে এবং মুহূর্তেই তা পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। বাবা বললেন, ওগুলো হলো মিলিটারিদের রাসায়নিক পদার্থ। ওগুলো ছিটিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে আগুন লেগে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

 *************

সত্যিই পাড়া থেকে মিলিটারিরা চলে গেছে। হাকিম চাচা খবর দিলেন, লুটপাট শুরু হয়েছে। জামায়াত-মুসলিম লীগ আর বিহারীরা কাজে অংশ নিয়েছে। জ্বলে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের যা অবশিষ্ট আছে, সব ওরা লুটে নিচ্ছে। যেসব বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়নি, সে সব বাড়িতে তারা বেশি করে হানা দিচ্ছে। বাবা বললেন, চলতো, আমাদের বাড়িটা দেখে আসি। না হলে লুটপাট হয়ে যেতে পারে।

আবার বাড়ির পথে রওনা হয়েছি। পথে কোথাও মিলিটারি দেখা গেলো না। চারধারে শুধু  পোড়া বাড়িঘর আর ধ্বংস স্তুপ। পোড়া বাড়িগুলো থেকে এখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছে। বীরেণ ডাক্তারের বাড়ি সামনে একটা হারমোনিয়াম উল্টে পড়ে আছে। গোটা বাড়িটার ভিটে জুড়ে শুধু ছাই ছড়িয়ে রয়েছে।

আমাদের বাড়িতে এলাম। সব ঠিক আছে এখনও, কিছুই হয়নি। বাবা সব কিছু দেখেশুনে ভালো করে তালা লাগিয়ে দিলেন। আশে পাশে খোঁজ নেয়া হলো। শরীফ-রুমদের বাড়িটাও ঠিক আছে। উত্তর পাশের সেই বুড়ি বাড়িটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বাঁশ ঝাঁডগুলো থেকে এখনও ধোঁয়া উড়ছে। পশ্চিমে বিশু দাদাদের পাকা বাড়িটায় আগুন দেয়া হয়নি, কিন্তু ভিতর থেকে ককিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে। বাবা আমাকে রাস্তায় পাহারার দায়িত্ব দিলেন, তারপর খোঁজ নিতে ভিতরে ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পর বাবা এলেন। বললেন, মিলিটারিরা বিশু দাদার কাকাকে গুলি করেছে। গুলিটা তলপেট ফুটো করে বেরিয়ে গেছে। তবে এখনও সে বেঁচে আছে। প্রচুর রক্ত ঝরছে। হয়তো বাঁচবে না। বিশুদাদার মা এবং মহিলারা রক্তাক্ত শরীর ঘিরে বসে কাঁদছে। বাবা বললেন, মিলিটারিরা বিশুর কাকাকে কলেমা পড়তে বলেছিল, কিন্তু সে পড়তে পারেনি। তাই গুলি করা হয়েছে। অবশ্য তার আগে বাড়ির অন্য সবাই লুকিয়ে পড়েছিল বলে রক্ষা পেয়েছে।

বাবা বললেন, চল বাড়ি যাই, ডেটল নিয়ে আসি। ডেটল দিলে রক্ত পড়া বন্ধ হতে পারে। বাড়িতে এলাম। এক শিশি ডেটল ছিল। শিশি নিয়ে বাবা আবার বিশুদাদাদের বাড়ি ঢুকলেন। আমি পথে পাহারায় দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর বাবা ফিরে এসে বললেন, প্রচুর রক্ত পড়ছে। শিশির ডেটল ঢেলে শেষ করে ফেলেছি। কিন্তু রক্ত বন্ধ হলো না। গুলিটা একেবারে হাড়গোড় ভেঙ্গে বেরিয়ে গেছে। মনে হয় কোনোভাবেই বাঁচবে না। বাবা বললেন, চল আমরা চলে যাই। এখন আর করার কিছুই নেই। মৃত্যুর মুখে বিশু দাদা কাকা আর তার বাড়ির সবাইকে  ফেলে রেখে দ্রুুত জলিল চাচার বাড়ির পথ ধরলাম। পথে বিহারী আশরাফ খানের সঙ্গে দেখা হল। তিনি বাবাকে নিশ্চিন্তে থাকতে বললেন। জানালেন কোন অসুবিধা নেই। সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। মহিদুল ভাইয়ের বাবার সঙ্গেও পথে দেখা হলো। তিনি বললেন, সব সময় যোগাযোগ রাখবেন।

বাড়ি এলাম। পিছন দরজা দিয়ে হাকিম চাচা ঢুকলেন। তিনি চারদিকে ব্যাপক লুটপাটের আরও খবর দিলেন। এদিকে জলিল চাচার বাড়িতে আমরা অবরুদ্ধ হয়ে গেলাম। বাইরে বের হবার উপায় নেই। যদিও পাড়ায় মিলিটারি নেই, তবুও বিপদ ঘটতে পারে। যে কোন আড়াল থেকে ওরা দেখে ফেলতে পারে এবং গুলি করতে পারে। গোটা শহরে কার্ফু জারি রয়েছে। গুলি করাই স্বাভাবিক। এমন অবরুদ্ধ অবস্থায় শোবার ঘরেই রান্না করতে হলো, খেতে হলো, এমনকি প্রকৃতির ডাকেও বাইরে যাওয়া হলো না।

বিকেলে নতুন খবর এল। শহরের সমস্ত দোকান, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরে ব্যাপক লুট হচ্ছে। মিলিটারিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সব দেখছে, কিন্তু কিছু বলছেনা। লুটকারিরা সোনার দোকানগুলো ভাঙ্গছে। সোনা-দানা-টাকা নিয়ে যাচ্ছে। মুদিখানা আর স্টেশনারি দোকানগুলো ভেঙ্গে লোকজন চাল, ডাল, আটাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।

শহরের সোনাপট্টিতে আমাদেরও একটি বিরাট দোকান আছে। বইয়ের দোকান। বাবা দোকানটির জন্য শংকিত হলেন। আমাকে নিয়ে আবার বাড়িতে এলেন। তারপর দোকানটা দেখে আসতে বললেন। বললেন, ‘শহরে লুটপাট হচ্ছে। আমাদের দোকানটা ঠিক আছে কিনা দেখা দরকার। তুই গিয়ে দেখে আয়। ছোট আছিস বলে  তোকে কেউ কিছু বলবে না।

নির্দেশ মত পথে নামতেই চোখে পড়লো লোকজনের আনাগোনা। এদের বেশির ভাগই জামায়াত এবং মুসলিম লীগের সদস্য সমর্থক। সবাই শহর থেকে দ্রুত ফিরছে। ওদের হাতে সোনা-দানা ভর্তি বাক্স, থলে ভর্তি ঘড়ি, টাকা, বস্তা ভর্তি চাউল, আটা, কাপড়সহ দামি দামি অনেক কিছু। ঘাড়ে তুলে বা মাথায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লুটের মাল। রথঘর, গোলা, এডওয়ার্ড কলেজ রোড, নতুন ব্রীজ সবখানে একই দৃশ্য। মাল নিয়ে অনেক মানুষ আসছে। পথে দুই-তিনজন করে মিলিটারি চোখে পড়লো। ওরা নির্লিপ্তভাবে ধূমপান করছে।

ব্রীজের ঢালে চিত্রায়ণ স্টুডিও। তার দরজা কপাট ভাঙ্গা, সামনে ফটো নেগেটিভ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ট্রাফিক  মোড়  থেকে ডানে গিয়ে বামে নতুন গলির পথ। পথ পাড় হয়েই বামে সোনাপট্টিতে আমাদের দোকান। না,  দোকানের কোন ক্ষতি এখনও হয়নি। তবে আশপাশের সবগুলো সোনার দোকানের দরজা কপাট ভাঙ্গা এবং লন্ড ভন্ড হয়ে আছে। ভিতরে উকি দিয়ে দেখলাম, সোনা টাকার সিন্দুকগুলি গড়াগড়ি খাচ্ছে। সব দুমড়ে মুচড়ে রয়েছে। অনেক দোকানের মধ্যে তখনও লুটকারীরা লুট চালাচ্ছে। প্রচন্ড শব্দে ওরা সিন্দুক ভালাছে। তারপর  সোনা-দানা টাকা-পয়সা কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে নিচ্ছে।

সোনার দোকানগুলো হিন্দুদের। অনেক দোকানই ভাংচুর লুট হয়েছে, কিন্তু বিহারীদের দোকান পাটের কোনো ক্ষতি হয়নি। সেগুলোতে দিব্বি তালা ঝুলছে।

সোনাপট্টির গলি ছেড়ে বাজারের গলিতে এলাম। গলিতে শুধু কাপড়ের দোকান। সব দোকানে ব্যাপক লুট হচ্ছে। বহু লোক লুটে অংশ নিয়েছে। এরমধ্যে চোখে পড়লো- একজন মিলিটারি ক্যামেরা দিয়ে টপাটপ লুটের ছবি তুলছে।

বেনিয়াপট্টি থেকে গলির মাথায় আরেকটি স্টুডিও। এটিও লন্ড ভন্ড অবস্থায় রয়েছে। দরজা কপাট হা করে  খোলা। হঠাৎ দই বাজারের দিক থেকে মেশিনগান উঁচিয়ে মিলিটারি ট্রাক এগিয়ে এলো। সশস্ত্র মিলিটারি দেখে লুটকারীরা কেউ পালালো না। তবে লুট বদ্ধ করে তাকিয়ে রইলো। জংলী হেলমেট মাথায় দেয়া মিলিটারিদের ট্রাকটি চলে গেলো। তারপর শুরু হলো আবার লুট।

কী করব ভেবে পাচ্ছিনা। বিপদ হতে পারে মনে হলো। ফিরতি পথ ধরলাম। সোনা পট্টি ধরে উত্তর দিকে এগুলাম। তারপর আতাইকুলা সড়ক ধরে পশ্চিমে। একজন বলল, মিলিটারিরা গুলি চালাতে শুরু করেছে। ভয়  পেয়ে গেলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে গুলি হতে লাগলো। মেইন রোডের দিকে দ্রুত ছুটলাম। আবার গুলির শব্দ হলো। মিলিটারি নেই দেখে অনেকের সঙ্গে দৌঁড়ে রাস্তা পার হলাম। হঠাৎ একজন মাঝখানে বসে পড়লো। পিছে তাকিয়ে দেখি লোকটির হাত রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সে ব্যাঙের মত লাফাচ্ছে। গুলি লেগে তার হাত গুড়িয়ে গেছে। এবার আর কোনো দিকে না তাকিয়ে বাড়ির দিকে ছুটলাম। পড়িমড়ি করে নতুন ব্রীজের ঢাল দিয়ে আলীয়া মাদ্রাসা হয়ে জলিল চাচার বাড়ি পৌঁছলাম।

 **********

পরদিন দুপুর। আতঙ্কজনক পরিস্থিতি আরও দিশেহারা করে তুললো। মিলিটারিরা এবার মেয়ে মানুষ খোঁজা শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানী পশ্চিম পাকিস্তানি কয়েদিদের নিয়ে গঠিত মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছে। বিভিন্ন মুসলমান বাড়িতে যারা রয়েছে, তাদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে ওরা। বালিকা, কিশোরী থেকে যুবতী, পূর্ণ যুবতীদের ওরা আটক করছে। তারপর ভালো হয় তাদের ক্যাম্পে বা নিারপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, অথবা বাড়ির লোকজনের সামনেই তাদের উপর ধর্ষণ চালাচ্ছে। কেউ বাধা দিতে পারছে না। বাধা দিলেই তাকে গুলি অথবা বেয়নোট চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। মেয়ে মানুষের ব্যাপারে পাঞ্জাবী মিলিটারিদের একেবারেই হিতাহিত জ্ঞান নেই। ওরা জামায়ত-মুসলীম লীগের লোকদেরও খাতির করছে না। যেখানেই মেয়ে মানুষ পাচ্ছে, সেখানেই হানা দিচ্ছে এবং ধর্ষণ চালাচ্ছে। খবর এলো, পাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি মেয়েকে বাবা-মা সামনেই ধর্ষণ করা হয়েছে। কোনো বাবা-মা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কোনো কোনো পরিবারের লোক বন্দুক   বেয়নেটের মুখে আপোসেই মেয়েদের মিলিটারিদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে।

হঠাৎ দেখা গেলো আমাদের বাড়ি আশপাশে একদল খাঁকি পোশাকধারী মিলিটারি ঘোরাঘুরি করছে। ওদের হাতে অবশ্য কোন অস্ত্র নেই। ওরা মানুষজন দেখলেই জিজ্ঞেস করছে. লারকী কাঁহা। ইধার লারকী নেহী?

বাবা বললেন, আর নয়। চল পালাই। কথামত আমাদের নতুন প্রস্তুতি শুরু হল। আমরা আর অপেক্ষা না করে হাতের কাছে প্রয়োজনীয় যা পাওয়া গেলো, তাই নিয়ে পিছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হাকিম চাচা থেকে  গেলেন। দিশেহারার মত ছুটলাম। আমতলা বাঁশতলা ঝোঁপ ঝাড়ের মাঝ দিয়ে ইঁদুরের মত নীচু হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে উত্তর দিকে চলেছি।

ডাকবাংলো-ডিগ্রি কলেজ সড়ক পাড়ি দিলাম। তারপর একইভাবে বিভিন্ন আড়াল দিয়ে মাঠ ঝোপ পেরিয়ে এগুলাম। অনেকক্ষণ হাঁটার পর পৌঁছলাম আগের সেই সিঙ্গায়। আশ্রয়ও নিলাম সেই আগের বাড়িতে। আশ্রয়দাতা দুদিন পর আমাদের দায়িত্বে গোটা বাড়িটা ছেড়ে চলে গেলেন গ্রামের বাড়ি। কারণ তার পরিবার সেই গ্রামে রয়ে গেছে। [চলবে]

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ