স্মৃতির জানালা : এগারো
১৯৭১
অনেকদিন পার হয়ে গেল। নতুন করে সিঙ্গা আসার পর উত্তেজনা আর সংশয়ের মধ্যে দিন কাটছে। এর মাঝেও প্রতিদিনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে শহরে বাড়ি দেখে আসা, নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়া, বাবার হুকুম তামিল করা, আর রেডিওতে গান ও খবর শোনা। আমরা যে বাড়িটায় রয়েছি, সেখানে মোট তিনটি ঘর। দুটি থাকার ও একটি রান্নার। আমাদের জন্য একটি থাকার ঘর ও রান্নার ঘর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অন্য ঘরটি বাড়িওয়ালা নিজের জন্য রেখেছেন। আমাদের থাকার ঘরটি দুই ভাগে বিভক্ত। সদরের অংশ বৈঠকখানা আর ভিতরের অংশ থাকবার। উত্তর দুয়ারে বাঁশের তৈরি কাঁচা পায়খানা।
**********
সিঙ্গার এ গ্রামে আমাদের পাড়া থেকে আরও অনেকে এসেছে। মহিদুল ভাইদের পরিবারসহ বন্ধু কিরণরাও এসেছে। কিরণরা অবশ্য বেশ দূরে আশ্রয় নিয়েছে। ওর সঙ্গে একদিনও দেখা হয়নি। তবে ওর ছোট বোন শোভার সঙ্গে এক ফসলের মাঠে একদিন দেখা হল। শোভা বলল, ওরা ইছামতি নদীর পাড়ে নানার বাড়িতে রয়েছে।
**********
শহরের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। মিলিটারিরা শুধু মানুষ হত্যা করছে। শোনা যাচ্ছে, ২৫ মার্চের পর থেকে পাবনা শহর মুক্ত থাকার সময় যতবার বিমান হামলা হয়েছিল, ততবার মুক্তিযোদ্ধারা বিমান লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি চালিয়েছিল। ঐ সময় নাকি বিমান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানগুলোর ছবি তুলে রেখেছিল। এখন সেই ছবি দেখে দেখে জায়গাগুলো খুঁজে বের করা হচ্ছে এবং সেখানকার সব বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে। সেখানে যাদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং হত্যা করা হচ্ছে।
**********
মিলিটারি ক্যাম্প করা হয়েছে এডওয়ার্ড কলেজের কাছে পানির ট্যাংকির নীচে, ওয়াপদা, ডাকবাংলো, বিসিক শিল্পনগরী, জিন্নাহ পার্ক আর পলিটেকনিকের ভিতরে। এইসব ক্যাম্পেই মানুষ ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
**********
গ্রামে চলাচলের পথ হিসেবে সিঙ্গার পথটি অন্যতম। আমাদের আশ্রয়স্থলের শ’খানেক গজ দূরে এ পথ। এ পথ দিয়ে এখনও শহর থেকে সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই গ্রামের পথে পালায়। কেউ কেউ এ পথ ধরে গ্রাম থেকে শহরে আসে ফেলে আসা ভিটে মাটির খোঁজ নিতে। মানুষগুলোর ধরন এখন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। রাতারাতি তারা সবাই জিন্নাহ টুপি আর পাজামা পাঞ্জাবী পরা ধরেছে। মুখে দাঁড়ি রাখা শুরু করেছে। মানুষগুলো আবার চোখে গাঢ় করে সুরমাও লাগায়। এছাড়া বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সবাই বার কয়েক করে কলেমা মুখস্ত করে নেয়। কারও কারও হাতে তসবিহও থাকে। এসবই যেন এখন একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত শহরমুখো হওয়া যায়, ততই এসব দৃশ্যের ছড়াছড়ি চোখে পড়ে। এ এলাকার জন্য সিঙ্গা প্রাইমারি স্কুল মাঠে বাজার বসে। বাবা মাঝে মাঝেই সেখানে যান। এ সময় লক্ষ্য করি, পাঞ্জাবী আর টুপি পরা মানুষগুলো শুধু শহরের দিকে তাকিয়ে ইতি-উঁতি আর কানাঘুষা করে।
জামায়াত-মুসলিম লীগ সমর্থকরা ঘুষঘাষ করে আলাপ করে। এত হত্যা, অত্যাচার, ধ্বংসযজ্ঞ, লুটপাটের পরেও তারা পাকিস্তানের প্রশংসা করে। তারা বলে, ‘পাকিস্তান হল মুসলমানের দেশ, পবিত্র দেশ। কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ অনেক স্বপ্ন নিয়ে এদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এদেশে মুসলমান হবে মুসলমানের ভাই। এদেশে মাথা উঁচু করে মুসলমানরা বেঁচে থাকবে। কিন্তু ষড়যন্ত্র করছে ভারত। ভারতের দালালরা মুসলমানদের মাথাকে নীচু করে দিতে চায়। দেশটাকে তারা হিন্দুদের গোলাম বানাতে চায়।’ আক্ষেপে তারা আলাপ করে, ‘এদেশের লোকজন না বুঝে ভারতের দালালদের ভোট দিয়েছে। এজন্যই তো লোকজনের উপর আল্লাহ’র গজব নেমে এসেছে।’
***************
নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাই। প্রচুর লোক হয় এতে। এখানেও বোঝানো হয়, ‘আপনারা কেউ ধৈর্য্যহারা হবেন না। পাপিষ্ঠদের শিক্ষা দেয়ার জন্যই আল্লাহ এই গজব নাজেল করেছেন। এ সময় ভাল মানুষদেরও একটু আধটু কষ্ট তো হবেই। ধৈর্য্য ধরুন, সব পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে। কেউ দুঃখ করবেন না। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন। কারণ তিনি যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন।’
পাকিস্তানের সমর্থকরা অনেক বোঝায়। ওরা বলে, ‘মিলিটারিদের এদেশে পাঠানো হয়েছে পাকিস্তান রক্ষা করবার জন্য। ভারতের দালাল শেখ মুজিব তো এদেশকে ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিল। ওরা আসলে পাকিস্তান আর ইসলামকে ধ্বংস করার চক্রান্ত করেছিল। এখন সে চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে গেছে। তাই সবাইকে এবার পাকিস্তান রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।’ পাক বাহিনীর অত্যাচার, নারী ধর্ষণ সম্পর্কে যখন প্রশ্ন আসে- তখন ওরা বলে, ‘মানুষ সবাই তো আর ভাল হয় না। পাকবাহিনীর মধ্যে দু-একজন খারাপ লোক থাকা অস্বাভাবিক নয়। ঐ দু-একজনের জন্য গোটা পাকবাহিনীকে দোষারোপ করা ঠিক না।’
এইসব দেশি দালালরা দিনে দিনে অনেক কথা ছড়ায়। ওরা প্রায়ই বলে, ‘পাকবাহিনী ভারতের ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দিয়েছে। পাকিস্তানের পবিত্রতাকে তারা রক্ষা করেছে। মুসলমানদের রক্ষা করেছে।’ ‘হিন্দুদের সেই দালাল শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা পাকিস্তান ভাঙ্গতে চায়, ভারতের দালাল আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।’ পাকিস্তানপন্থী এই লোকগুলো, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে ‘দেশদ্রোহী’ কাজ বলে প্রচারণা চালায়। লোকজনের মনোভাব বুঝে ওরা বিভিন্ন কথা বলে। কখনও বলে, ‘শেখ মুজিব লোকটা ভাল নয় বলেই ইয়াহিয়া খান তাকে ক্ষমতা দেয়নি।’ কখনও বলে ‘শেখ মুজিবের জন্যই দেশের উপর বিপদ নেমে এসেছে।’ কখনও বলে, ‘কেউ পাকিস্তান ধ্বংস করতে এলে তো মিলিটারিরা বাধা দেবেই। এটা আইনের কথা। আওয়ামী লীগ দেশটাকে
ধ্বংস করতে চেয়েছিল, মিলিটারিরা দেশকে রক্ষা করেছে। এ সময় একটু জোর-জবরদস্তির ঘটনা এমন কিছু নয়। এটা তো হবেই। কারণ এই মিলিটারিরা তো আর এদেশের লোকদের চেনে না, জানেনা কে ভাল কে মন্দ। সুতরাং এক আধটু জুলুম সহ্য করতেই হবে। ’
যেসব দালাল বা লোকজন পাকিস্তানের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, তারা খুব সাবধান। ছেলে ছোকরাদের দেখে এরা সতর্ক থাকে। যুবকদের সামনে বেশি কথা বলে না। হতাশার ভাব ছড়ায়। তরুণ যুবকদের ভয় পাবার কারণ হল, তারা সবাই স্বাধীনতার ব্যাপারে খুব আবেগপ্রবণ। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বা পাকিস্তানের গুণগান শুনলে তারা ক্রুদ্ধ হয়। তাই জামায়াত-মুসলিম লীগ ও অন্যান্য পাকিস্তান সমর্থকরা খুব সাবধানে কথা বলে। বিশেষতঃ এরা নিজেদের মধ্যে বেশি আলাপ করে। আমি পিচ্চি বলে ওদের মাঝে যেতে পারি। কথা বলার সময় সতর্ক হয়না ওরা। প্রায়ই ওদের মুখে শুনি, ‘দেশ থেকে আওয়ামী লীগাররা সব পালিয়ে গেছে, অনেকে ধরাও পড়েছে। এমনিতে দেশের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। আর ক'দিনের মধ্যেই লোকজন বাড়ি ফিরতে পারবে।’
[চলবে]




0 মন্তব্যসমূহ