Header Ads Widget

Responsive Advertisement

স্মৃতির জানালা : সাত

        কাল্পনিক ছবি
 

স্মৃতির জানালা : সাত

আবুল হোসেন খোকন

বাবা ধর্মান্ধ। পরিবার রক্ষণশীল। এই কট্টর বাস্তবতায় বড় হয়েছি। আগে অবশ্য এতোটা খারাপ অবস্থা ছিল না। বাবা তখন অনেকটাই উদারপন্থী ছিলেন। তিনি মাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা উৎসবে যোগ দিতেন। উৎসবে বসে থেকে প্রতিমা দেখতেন। হিন্দু বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করতেন। সেখান থেকে আমাদের জন্য খাবার-দাবারও আসতো। তখন রায়টের সময় ছিল। প্রায় রাতই হিন্দু পরিবারগুলোর উপর মুসলিমদের হামলা চালিয়ে লুটপাটের আতঙ্ক কাজ করতো। রায়ট ঠেকানোর ভান করতে সরকার থেকে ১৪৪ ধারা বা কার্ফ্যু জারী করা হতো। কিন্তু রাতের বেলা রায়ট চলতোই। এমন অবস্থায় বাবা হিন্দু পরিবারগুলোকে আমাদের বাড়িতে লুকিয়ে থাকার জন্য আশ্রয় দিতেন। এসব দেখেছি একেবারেই ক্ষুদে বয়সে।

কিন্তু সেই বাবার মধ্যে পরিবর্তনটা আসতে থাকে আলীয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক পেশায় যোগ হওয়ার পর থেকে। ওই মাদ্রাসা ছিল মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী এবং জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি। সেখানে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি ধর্মান্ধ হতে থাকেন। তাছাড়া তার মধ্যে একটা সুযোগ সন্ধানী নীতি আগে থেকেই ছিল, যে কারণে জ্ঞান হবার সময় থেকেই আমার ভেতর তাঁরপ্রতি একটা অপছন্দের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে থাকে। তাই একটা সময় পর্যন্ত বাবা এবং পরিবারের প্রতি আমার যে টান ছিল, সেটা কমতে থাকে। বলা যায়, শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিতে থাকে। রক্ষণশীল জীবন থেকে মুক্তির জন্য নিজের মধ্যে একটা স্বাধীনতা পাওয়ার প্রবল বাসনা জোরদার হয়। এই বাসনাই পারিবারিক চিন্তাধারার বিপরীত বইপত্রের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে। সবমিলিয়ে ৬৮-৬৯ এবং ৭০-এর রাজনৈতিক আন্দোলন নতুন অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

        কাল্পনিক ছবি

৭০-এর নির্বাচনের পর বেপরোয়াপনা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। পিটুনি খেয়েও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ছুটতাম। লাইব্রেরি বা বিভিন্নজনের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। স্কুলে গিয়ে মিছিলে যোগ দিতাম। ফাঁক পাওয়ামাত্র বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে জড়ো হয়ে ডিগ্রি কলেজের পরিত্যক্ত জায়গায় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলতাম। রমজান মাসে মসজিদে তারাবির নামাজ পড়তে যাওয়ার সুযোগে রাজনৈতিক দলের স্লোগানকে অনুকরণ করে দেওয়ালে দেওয়ালে লিখতাম। প্রতিপক্ষের বিশেষ করে নকশাল, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী এবং জামায়াতে ইসলামীর দেওয়াল লিখন নষ্ট করে দিতাম। পোস্টার ছিঁড়ে দিতাম। এইসব কাজে আমার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সঙ্গ দিয়েছে বন্ধু কিরন। ওর বাবা আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল বলে ওকে পাচ্ছিলাম। যদিও ব্যক্তিগতভাবে ওর বাবা খুব একটা সুবিধার লোক ছিলেন না। কারণ হিন্দুদের বিরুদ্ধে রায়টে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। স্বার্থ হাসিলের নানাদিক চিন্তা করে তিনি চলতেন।

২৮ মার্চ ১৯৭১ : আমাদের তিন ব্যান্ডের একটা রেডিও ছিল। তাতে হাত দেয়ায় ছিল বিধিনিষেধ। কিন্তু সময় পাল্টো যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। এখন খবর শোনার জন্য ঘন ঘন নব ঘোরানো ছিল আমার গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শুনছিলাম গতকাল মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বেতার কেন্দ্র চালু হয়েছে। আমি খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম সেই বেতার  কেন্দ্র। এদিন সকাল থেকে নব ঘোরাচ্ছিলাম। ঘাঁটাঘাঁটি করে কাজ হচ্ছিল না। ঘরের চালার উপর লম্বা একটা এন্টেনা ছিল। সেটায় সংযোগ করা ছিল না। আমি এবার সেখানে লম্বা তার দিয়ে সংযোগ লাগিয়ে দিলাম। এতেকরে রেডিওর সেন্টারগুলো জোড়ালো এবং আরও স্পষ্ট হলো। এবার আরও নিখুঁতভাবে খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। তখন দুপুর গড়িয়েছে।

এক সময় হঠাৎ- চমকে উঠলাম। কারণ পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত সেই স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র। সময় কে যেন  ঘোষণা পাঠ করছিল। যুদ্ধের জন্য বাঙালিদের ডাক দিচ্ছিল। নব নাড়তেই সেটা স্পষ্ট হল। এবার পরিষ্কার  বোঝা গেল কথা। মেজর জিয়া বলছি এমন একটি ঘোষণা হল। উত্তেজনায় কাঁপন এসে গেল। রেডিও নিয়ে ছুটলাম বাইরে। বাবাসহ অন্যান্যরা কয়েসদের বাড়ির সামনে রেডিও নিয়ে জটলা করছিলেন। তাদের মাঝে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র বাজিয়ে দিলাম। সবাই চোখ বড় বড় করে রেডিওর কাছে গিয়ে কান পেতে শুনল।  বেতার থেকে বার বার একটি ঘোষণা প্রচারিত হচ্ছিল। ঘোষণায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশ পাঠ করে  শোনাচ্ছিলেন মেজর জিয়া। বলছিলেন, শেখ মুজিব স্বাধীনতা যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। সবাইকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছেন।

হইচই পড়ে গেল চারদিক। উত্তেজনার শিহরণ টগবগ করে ফুটতে লাগল। মনে হল উত্থানের মহাসমুদ্রে এসে পড়েছি। আর দেরি নেই। এখনই ঘটে যাবে নতুন কিছু। আমাদের চোখে মুখে যেমন খুশির উত্তেজনা উপচে পড়ছে, তেমনই উল্টো অবস্থা বাবা এবং তার বন্ধুদের মাঝে। তারা সবাই নির্বাচনে পরাজিত জামায়াতে ইসলামী আর মুসলিম লীগের সমর্থক।

এদিন বিকেলেই তাদের কারও কারও মুখে বলতে শুনলাম, যুদ্ধ করা অতো সহজ কথা নয়। পাকিস্তানি মিলিটারিরা হলো পৃথিবীর সেরা মিলিটারি। দুনিয়ার সব দেশের মিলিটারিরা তাদের ভয় পায়। আর তাদের সঙ্গেই শেখ মুজিবের কয়েকজন লোক যুদ্ধ করবে! অতো সহজ নয়। সবগুলোকে যখন গুলি করে শেষ করে দেবে, তখন বুঝবে। কেউ কেউ বলছিল, বাঙালিরা সব পাগল হয়েছে। ধর্ম কর্ম বাদ দিয়ে শেখ মুজিবের কথায় নাচা শুরু করেছে। কেউ বলছিল, শেখ মুজিব ভোট পেয়েছে তো কী হয়েছে? তাকে কি পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য ভোট দেয়া হয়েছে? কেউ কেউ বলছিল, সব ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র। শেখ মুজিব আর আওয়ামী লীগ তো ইন্ডিয়ার দালাল।

বিভিন্ন স্থান থেকে নানা খবর আসতে লাগল। শোনা গেল, শহরে মিছিল বের হয়েছিল। মিলিটারি ট্রাকের দিকে তারা বাঁশ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। সময় মিলিটারি গুলি চালিয়েছে। তাতে অনেকে হতাহত হয়েছে। সন্ধ্যায় জানা গেল, কৃষ্ণপুরে জানাজার উপর গুলি চালানো হয়েছে। এর আগে মিলিটারির গুলিতে শুকুর আলী নামে একজন মারা গেছে। তারই জানাজা হচ্ছিল।

রাত নামল। আরও খবর পাওয়া গেল। পাশের গ্রাম শালগাড়িয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মিলিটারি ঢুকে পড়েছে। তারা ঘরে ঘরে ঢুকে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। কয়েকটি বাড়িতে বাচ্চা শিশুদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। কোন কোন বাড়িতে ঢুকে মায়ের কোল থেকে বাচ্চা কেড়ে নিয়ে মাটিতে আছাড় মেরে হত্যা করেছে। মিলিটারিরা বাড়ি থেকে চলে যাবার সময় যুবতী-বউ-মেয়েদের ধরে নিয়ে গেছে। এই খবরের পর এল আরও ভয়ংকর খবর। এবার মিলিটারিরা আমাদের পাড়ার দিকে নাকি রওনা হয়েছে।

সব শুনে বাবা বাড়ির গেটে তালা লাগিয়ে দিলেন। একটি ধারালো ফালা নিয়ে পায়চারি করতে লাগলেন। মাঝে মাঝে উঁকি দিলেন বাইরে। আমরা খাটের নীচে পরিখার মত বিরাট গর্তে লুকিয়ে। গোটা পাড়ায় নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। রাতের প্রাকৃতিক শব্দগুলোই শুধু যেন তখন জেগে আছে। আর সব নিরব নিথর মৃত। এই নিরবতাকে ক্রমে গ্রাস করতে লাগল প্রাকৃতিক শব্দ। এই শব্দগুলোই এক সময় বিকট হয়ে কানে বাজতে শুরু করলো। এভাবে প্রথম প্রহর গড়িয়ে গেল।

(চলবে)

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ