স্মৃতির জানালা : তেরো
আবুল হোসেন খোকন
১৯৭১ : আমরা প্রতিদিন সকাল ও রাতে দু’বেলা স্বাধীনবাংলা বেতার শুনি। দু’বেলাই সেন্টার খোলা হয়। এই বেতারের ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানটি শুনে সবাই খুব মজা পান। ওতে মিলিটারিদের এমন ব্যঙ্গ করা হয় যে, আনন্দে গড়াগড়ি খেতে ইচ্ছে করে। খুব হাসি পায়। মুক্তিবাহিনীর ‘ক্যাচকা মাইর' শব্দগুলো রসিয়ে রসিয়ে বলা হয়। সবকিছু মিলিয়ে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের এসব অনুষ্ঠান দারুণভাবে জনপ্রিয় ।
মাত্র ক’মাসেই মানুষজন সাহসী হয়ে উঠেছেন। মিলিটারির নাকানি-চোবানি খাওয়ার ঘটনা নিয়ে এখন মুখরোচক আলোচনা জমে ওঠে। বাঙালিদের দেশে এসে এই খান সেনারা কেমন পরিণতি ভোগ করছে- তা নিয়ে হাসি ঠাট্টা বেড়ে গেছে।
আমরা এখন কৈজুরিতে। প্রত্যন্ত গ্রাম। পায়ে হাঁটা ছাড়া পথ নেই। এখান থেকে বাবা পাবনায় বাড়িঘরের খবর রাখছেন। এখান থেকে অন্ততঃ ১০ মাইল পায়ে হেঁটে, তারপর মাইল খানেক নৌকায় উঠে এবং আরও ৫০/৬০ মাইল বাসে চড়ে পাবনা পৌঁছতে হয়। আবার একইভাবে ফিরতে হয়। এভাবে বাবা পাবনায় যাতায়া করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তিনি আলীয়া মাদ্রাসার চাকরিতেও যোগ দিলেন। এরপর তিনি আমাকেও পাবনা নিয়ে গেলেন। সেই থেকে শুরু হলো আমার স্থায়ীভাবে শহরে বসবাস।
বাবা চাকরিতে যোগ দেওয়ায় তিনি যতোক্ষণ বাড়িতে থাকেন না, ততোক্ষণ আমি ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে চারদিকে তালা দিয়ে লুকিয়ে থাকি। থাকার বড় ঘরের মাঝে বিরাট পরিখা বানানো আছে, বাড়ির উঠোনেও একটি পরিখা তৈরি করা হয়েছে। কারণ ইদানিংকালে যখন গুলি শুরু হয়, তখন পরিখায় লুকিয়ে পড়তে হয়। রাতের বেলা আলো জ্বালানো হয় না। অন্ধকারে থাকতে হয়। খাওয়া-দাওয়া দিনের বেলাতেই সেরে নিতে হয়।
বাবা বাড়িতে থাকুন বা না থাকুন- বাড়ির সমস্ত প্রবেশপথ বন্ধ থাকে। গেটে সব সময় তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়। এতেকরে বাইরে থেকে মনে হয়- এখানে জনমানবের কোন চিহ্ন নেই। কিন্তু ভিতরে আমরা ইঁদুরের মত লুকিয়ে বাস করি। এভাবেই চলতে থাকে অবরুদ্ধ বসবাস।
এখানে কিছু তথ্য বলে রাখা ভাল। যেমন, পাবনা শহরের ছয়-সাতটি স্থানে পাকবাহিনী ক্যাম্প করেছে। এরমধ্যে আমাদের এলাকায় রয়েছে দু’টি ক্যাম্প। একটি গোলা বা বটতলার কাছে রাধানগর পানির ট্যাংকের নীচে, এবং অন্যটি ডিগ্রি কলেজে। অন্য যেসব স্থানে ক্যাম্প রয়েছে সেগুলি হল ডাকবাংলো, ওয়াপদা ভবন, শিল্পনগরী, জেলা প্রশাসকের বাংলো, জিন্নাহপার্ক ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। রাজাকার, আল-বদরদের ক্যাম্প ডিগ্রি কলেজের একেবারে উত্তরে, আমরা যেখানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম সেইখানে। এছাড়া ক্যাম্প রয়েছে বাবার চাকরিস্থল আলীয়া মাদ্রাসায়, জামায়াত নেতা মওলানা আবদস সুবহানের বাড়িতে। সুবহানই এখানে রাজাকারের প্রতিষ্ঠাতা এবং শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।
মার্চে মিলিটারিদের বিরুদ্ধে যেসব নকশালপন্থীরা যুদ্ধ করেছিল, এখন তারাও পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে যোগ দিয়েছে। তাদের ক্যাম্প এডওয়ার্ড কলেজে। প্রায়ই দেখা যায় মাসুদ ভাই এবং শহীদ ভাই কোমরের দু’পাশে পিস্তল ঝুলিয়ে ঐ ক্যাম্পে আসা-যাওয়া করছেন।
-------------------------
শহরে এখন কিছু দোকান পাট খুলেছে। বাজার ঘাট চালু হয়েছে। যানবাহনও চলাচল করছে। তবে সবই চলছে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। তীব্র আতংক আর অনিশ্চিত অবস্থায় লোকজন চলাফেরা করেন, কাজকর্ম করেন। বাবার আলীয়া মাদ্রাসাও খুলেছে। কিন্তু সেখানে কোন ছাত্র আসে না, ক্লাশ হয় না। তবে নিয়মিতভাবে সেখানে রাজাকারদের প্রশিক্ষণ হয়।
পালিয়ে যাওয়া লোকজনের পরিবার এখনও শহরে ফেরেনি। তবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের অবশিষ্ট টুকু রক্ষার জন্য পরিবারের পুরুষ সদস্যরা আসা-যাওয়া করেন। অবশ্য যুবক ও তরুণরা আসে না। আসেন বৃদ্ধ আর আমার মত শিশুরা। কারণ যুবক ও তরুণদেরকে মিলিটারিরা পেলেই ধরে নিয়ে যায়। তবে শহরে তরুণ ও যুবক বলতে যারা আছে তারা সবাই হয় রাজাকার, নয়তো আলবদর বাহিনীর সদস্য। বাঙালি বলতে এখন ওদেরই রাজত্ব। শহরে বাড়িঘর দেখার জন্য যেসব পুরুষরা আসেন, তারা বেশির ভাগই রাতে শহরে থাকেন না। দিনভর পাহারার কাজ সেরে তারা নিকটবর্তী গ্রামে রাত কাটাতে চলে যান। প্রথম প্রথম আমি আর বাবাও তাই করতাম। সিঙ্গা গ্রামে চলে যেতাম। পরে বাদ দেয়া হয়েছে। আমাদের পাঁচ-সাত মাইল এলাকার মধ্যে কোথাও মহিলা নেই। মিলিটারিদের ভয়ে সবাই চলে গেছে গহীন গ্রামে।
-----------------------
প্রচার চালানো হচ্ছে, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। স্কুল কলেজও নাকি খুলবে শীঘ্রই। ‘রেডিও পাকিস্তান ঢাকা’ থেকে এসব বারবার করে বলা হয়। একজন বাঙালি মহিলা খুব উদ্ধত কণ্ঠে এবং কিছুটা অশ্লীল ভাষায় প্রায়ই বর্তমান ঘটনার পর্যালোচনা করে। মুক্তিযোদ্ধা, ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের বলা হয় ভারতীয় দুষ্কৃতকারী কিংবা অনুপ্রবেশকারী, মুসলমানের শত্রু। রেডিও ছাড়াও সংবাদপত্রেও একই প্রচারণা চালানো হয়। এ প্রচারণার দৈনিক পত্রিকাগুলি বিনামূল্যে সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। এতে থাকে- কথিত ভারতীয় দুষ্কৃতকারীদের অস্ত্রশস্ত্রসহ আত্মসমর্পণের বিবরণ, অথবা গ্রেফতার হওয়ার বিবরণ। আরও থাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় ‘চক্রান্তের’ বিস্তারিত প্রতিবেদন, মতামত ইত্যাদি। পত্রিকাগুলোতে পাকনেতাদের বিবৃতি, বাণী থাকে। তাতে খুব করে তুলে ধরার চেষ্টা থাকে যে, ‘পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।’ পাকিস্তানের প্রশংসায় পাতাগুলো ঠাসা থাকে। রাজনৈতিক দলের বিবৃতিও থাকে। এসব দলগুলো হল জামায়াত-মুসলিম লীগ প্রভৃতি। এই দলের নেতারা ছাড়াও শান্তি কমিটি নেতাদের বিবৃতি থাকে। জামায়াত-মুসলিম লীগ, শান্তি কমিটির বিবৃতিতে ভারতীয় চক্রান্ত এবং তাদের মদদপুষ্ট গুপ্তচর, ভারতীয় দালাল বা মুক্তিযোদ্ধাদের দমন করার আহবান থাকে, ধরিয়ে দেয়ার আহ্বান থাকে। ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষার জন্য সর্বত্র শান্তি কমিটি গঠনের আহবান জানান হয়, রাজাকার-আল বদর- আল শামস বাহিনীতে যোগ দেয়ার কথা বলা হয়।
তথ্য অফিসটি গুড় বাজারে। সেখান থেকেই সরকারিভাবে বিনামূল্যে দৈনিক কাগজগুলো বিলি করা হয়। বাবা আমাকে সেখানে পাঠান। আমি দৈনিক ইত্তেফাক নিয়ে আসি। ইত্তেফাকের দাম ২৫ পয়সা। কিন্তু বিনা পয়সার এই পত্রিকাও কাউকে নিতে দেখি না। মনে হয় আমিই বুঝি একমাত্র গ্রাহক। পত্রিকা বণ্টনকারী বাঙালিটি এজন্য খুশি হয়ে আমাকে আরও দু-একটি পত্রিকা অতিরিক্ত দিয়ে দেয়। এসব পত্রিকা হল দৈনিক পাকিস্তান, অবজারভার প্রভৃতি।
-----------------
আমাদের পাড়াটা এখন প্রায় জনশূন্য। এত বড় পাড়ার মধ্যে মাত্র কয়েক ঘরে মানুষ থাকে। আমরা ছাড়া কিরণদের বাড়িতে তপন ও কিরণ দুইভাই থাকে। কয়েসদের বাড়িতে থাকে কয়েসের বাবা ও মঞ্জু কয়েস দুইভাই। জামালদের বাড়িতে ওদের বাবাসহ আরও কয়েকজন থাকে। এ ছাড়া রয়েছে বিহারী পরিবারটি। আর কেউ নেই কোথাও। গোটা পাড়াটি তাই মৃতপুরীর মত। আমরা কেউ অপ্রয়োজনে বাইরে বের হই না। এক পাড়ায় কয়েক বাড়িতে লোক থাকা সত্ত্বেও কারও সঙ্গে কারও দেখা হয় না। রাস্তা ঘাটগুলো ফাঁকা থাকে। অবশ্য মাঝে মধ্যেই বুটের বিকট খট খট শব্দ তুলে মিলিটারি অথবা রাজাকাররা এ পথ দিয়ে হেঁটে যায়। রাজাকাররা ভাল ভাল বাড়িঘর দখল করার জন্য খোঁজখবর নেয়। লুটপাটের জন্য এদিক সেদিক উঁকি-ঝুঁকি মারে। আর মিলিটারিরা মেয়ে মানুষের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘোরে। [চলবে]




0 মন্তব্যসমূহ