Header Ads Widget

Responsive Advertisement

স্মৃতির জানালা : চার

স্মৃতির জানালা : চার

আবুল হোসেন খোকন 

একাত্তরের আগে থেকেই নিজস্ব একটা গন্ডি তৈরি হয়েছিল। কিছু বন্ধু-বান্ধব হয়েছিল। এরা সবাই ছিল বাড়ির আশপাশের। সবচেয়ে কাছের এবং প্রিয় বন্ধু ছিল শরীফ (পুরো নাম শরীফ হোসেন খান), ওর পিঠেপিঠি ভাইবোন জেসমিন, আজীজ এবং আল আমীন। আর ছিল রুম (ওর পুরো নাম কখনও জানিনি) বোন তুহিন। আমাদের বাড়ির পেছনে, মানে পূর্ব পাশে হাজি কুটির ছিল ওদের বাড়ি। এরও পূর্ব পাশে ছিল কিরন এবং বোন শোভা। উত্তর পাশে ছিল কয়েস (নূরুল ইসলাম কয়েস), মঞ্জু এবং মান্নু। সবাই ভাইবোন হিসেবে পিঠেপিঠি। তাই বয়সের খুব একটা তফাৎ দেখা হতো না। আরও উত্তর পাশে ছিল প্রিয় বন্ধু করিম (আবদুল করিম), শফি, জামাল জাকির। এরও উত্তরে ছিল সেলিম (সেলিম আকতার) এরা সবাই প্রথম দফার বন্ধু। তারপরে আরও হয়েছিল। যাদের মধ্যে আছে জাফর, চন্ডি, সুবীর, রবিউল, লাল প্রমুখ।

এই বন্ধুদের সঙ্গে চলতো পলান টুকটুক, কুতকুত, হাডুডু, গোল্লাছুট এবং চাকা খেলা। চাকা খেলাটা ছিল বাসের টায়ার থেকে পাওয়া চাকা, বা সাইকেলের চাকা কাঠির সাহায্যে দাবড়িয়ে বেড়ানো। পরে ফুটবল আর ক্রিকেট যোগ হয়েছিল। খেলা হতো গাছের বাদাম, অথবা গেঞ্জির ছাট দিয়ে তৈরি করা বল বানিয়ে। ক্রিকেটও গাছের বাদামকে বল বানিয়ে খেলা হতো। কালেভদ্রে সংগ্রহ করতাম কারও ফেলে দেওয়া টেনিস বল। একে কাপর দিয়ে ভাল করে পেচিয়ে শক্তপোক্ত করে নিতাম। আমাদের ব্যাট ছিল পরিত্যক্ত কাঠের অংশ বিশেষ।

আমাদের খেলার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা বলতে এখনও চোখের সামনে ভাসে তিনটি স্থান। একটি হলো হাজী কুটিরের ছোট্ট মাঠ, আরেকটি কয়েসদের বাড়ির পশ্চিমে কোমর সমান অসমাপ্ত করে রাখা একটি বিল্ডিং ভিত্তির সঙ্গে থাকা মাঠ এবং জামালদের বাড়ির উত্তর পাশে বিরাট খেলার মাঠ।

আমাদের মধ্যে চলতো রোমঞ্চকর আড্ডা। হয়তো কোন গাছের ডালে বসে মজার মজার কথা বলা। কিংবা চোখে পড়ে না এমন কোন আবডালে বসে নানা বিষয় নিয়ে মতামত বিনিময় করা। সবকিছুর মধ্যে অদ্ভুৎ এক রোমাঞ্চ কাজ করতো। এর বাইরে আমরা বাড়ির সঙ্গে থাকা নালায় গামছা দিয়ে বা বড়শি ফেলে মাছ ধরতাম। এর বাইরে এদিক ওদিকে ঘুরে ঘুরে নতুন নতুন জিনিসপত্র কুড়িয়ে বেড়াতাম। প্রতিবেশিদের কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করতাম। প্রতিবেশিদের বিপদ থেকে উদ্ধার বলতে মুরগি খুঁজে দেওয়া, ছাগল খুঁজে দেওয়া; গাছের সবজি বা কলা, সাজিনা, পেঁপে ইত্যাদি নামিয়ে দেওয়া, বাড়ির জঙ্গল পরিস্কার করে দেওয়া, এমনকি নর্দমার ময়লা পরিস্কার করার কাজও ছিল খেলার অংশ।

খুব ছোট সময়ে পড়ার জায়গা ছিল মক্তব। বাড়ি থেকে পশ্চিমে বেশ অনেকটা দূরে ছিল এটা (নারায়ণপুর মক্তব) একটা সময় পর্যন্ত আমার চেয়ে বেশ বড় এবং গাট্টাগোট্টা আরব নামে এক শিশু আমাকে হাত ধরে মক্তবে নিয়ে যেতো, আবার রেখে যেতো। মক্তবে আরবি পড়াটাই প্রধান ছিল। এই মক্তবের পরে সিঙ্গা ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। আরএম বা রাধানগর মজুমদার একাডেমিতেও অল্পদিন পড়েছি। সবশেষে পড়েছি অনেকটা দূরের সেলিম নাজির স্কুলে।

বলতে সমস্যা নেই যে, স্কুল গন্ডির পড়শুনায় ছিলাম একেবারেই লাড্ডু মার্কা। কোন পড়াই মাথায় ঢুকতো না, পারতামও না। বিশেষ করে বাবার আরবি পড়ার চাপ ক্ষেত্রে বড় অনীহার জায়গা তৈরি করেছিল। তবে লেখা-পড়ার আরেকটা গুনের দিক ছিল। সেটা হলো, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনার চেয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনায় দারুণ ঝোঁক কাজ করতো। মজার মজার গল্পের বই, ভ্রমণের বই, বিজ্ঞানের বই, ঐতিহাসিক ঘটনার বই পড়তে খুব ভাল লাগতো। পরে যোগ হয়েছিল ডিডেকটিভ বই। এই বই- নেশার মত হয়ে উঠেছিল। এইসব বই পড়ার জন্য বন্ধুদের বাড়িতে থাকা বইপত্র এবং শেষ দিকে পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ার ঝোঁক তৈরি হয়েছিল। বলা যায়, এসব বই- আমাদের পারিবারিক রক্ষণশীল চিন্তাধারা থেকে বাইরে বের করে আনার মাধ্যম হয়েছিল।

অন্যদিকে ছিল বাবার প্রচন্ড বিরোধিতা। আমার ধরণের পড়াশুনায় যার পর নাই তিনি ক্ষুদ্ধ এবং ক্ষিপ্ত ছিলেন। তিনি নানা কৌশল এবং কায়দায় জোর করে ধর্মীয় বইপত্র এবং কাহিনীতে মনোনিবেশ করানোর চেষ্টা করেন। এরজন্য পৈশাচিক নির্যাতনও করেন। কিন্তু সেটা হচ্ছিল হীতেবিপরীত। এভাবে আমাকে তার চিন্তার পথে তো নিতেই পারেননি, বরং তা আমার লাইনে পড়াশুনা এবং জানাশোনার প্রতি আগ্রহ আরও বেশি করে বাড়াচ্ছিল। বলা যায় কারণে, আমার নিজের শিক্ষা আর পারিবারিক শিক্ষার মধ্যে বড় মাত্রায় সংঘাত তৈরি হয়েছিল।

(চলবে)

 


 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ