Header Ads Widget

Responsive Advertisement

স্মৃতির জানালা : বারো


 স্মৃতির জানালা : বারো

আবুল হোসেন খোকন 

প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে শহরের বাড়ি দেখতে যেতে হয়। সিঙ্গা থেকে পুরো আড়াই/তিন মাইল হাঁটা পথ-ঘাট মুখস্ত হয়ে গেছে। পথ মাত্র দুটি। মূল কাঁচা সড়ক ছাড়াও রয়েছে জোংলা মেঠো পথ। চলতে খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। হঠাৎ মিলিটারির সামনে পড়ে যাবার ভয় থাকে। মূল সড়ক পথের সামনে নজর রাখাটা সবচেয়ে জরুরি। পথে শহরে যেতে প্রথমেই বামে পড়ে ডিগ্রি কলেজ। এখানেই এক সময় আমরাযুদ্ধ যুদ্ধ খেলেছি। ডান দিয়ে আর একটি পথ। পথ বেঁকে ইছামতি স্কুল হয়ে সোজা আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেছে। মূল পথ দিয়ে এটাই আমার জন্য বাড়ি যাবার পথ। আবার শহরের এই বাড়ি থেকে সিঙ্গা যাবার জন্য যে জোংলা মেঠো পথটা রয়েছে- তা বড্ড প্রিয়। জলিল কন্ট্রাকটর চাচার বাড়ি ঘেঁষে ঢুকতে হয় বিশাল ঝোপ ঝাড়ে। পোড়ো বাড়ি, বাঁশ ঝাড় পেরোতে হয়। তারপর ডাকবাংলো- ডিগ্রি কলেজ সড়ক পার হয়ে পাওয়া যায় আরও বনাঞ্চল। একলা চলা এখানকার পথ চলে গেছে সোজা সিঙ্গা। অনেক আমতলা, বাঁশতলা, কাঁঠালতলা, নারিকেল তলা, ফাঁকা মাঠ আর ফসলী ক্ষেত পেরিয়ে যেতে হয়। সময় অন্য রকম লাগে। মনে হয় জনমানবহীন কোন দ্বীপের বন বাদাড়  পেরিয়ে একা চলেছি, শু-ধু -কা। প্রকৃতি যেন অভ্যর্থনার আসন পেতে রেখেছে। আমার মত স্বাধীন-সুখী আর  কেউ নেই। আমি যেন বনের রাজা। অপরূপ বাংলাকে তখন বুকের ভিতরে খুব বেশি করে মনে হয়। গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে হয়, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।

এখানে স্বাধীনতা আছে, আবার ভয়ও আছে। এই চলার পথের পশ্চিমে ডাকবাংলো আর ওয়াপদা। দুটোতেই মিলিটারি ক্যাম্প। ঝোপ আর গাছ গাছালির আড়াল থেকে ডাকবাংলোর অংশবিশেষ দেখা যায়। বিরাট ফাঁকা  ক্ষেতের পরেই ওটা। জায়গাটা এজন্য বিপদজনক। মিলিটারিরা হঠাৎ দেখে ফেললে গুলি চালিয়ে পাখির মত হত্যা করবে।

মূল কাঁচা সড়ক দিয়ে যাওয়া-আসার পথে টুপিপরা মানুষকে খুব চোখে পড়ে। দারুণ সতর্ক চোখে চলে ওরা। এছাড়া আরও দৃশ্য চোখে পড়ে। পথের ধার দিয়ে, বিশেষ করে ডিগ্রি কলেজ থেকে আমাদের রাধানগর পাড়ার দিকে অনেক লুট করা বাড়ি ঘর বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিদিন বাড়িগুলোর জিনিসপত্র কমতে শুরু করেছে। বাড়ির চাল, বাঁশ, খাট, চেয়ার, টেবিল, বেড়া আগে ছিল। কিন্তু দিন দিন তা উধাও হয়ে যাচ্ছে। একদিন  দেখা গেল সব কিছু খা খা করছে, শুধু অবশিষ্ট রয়েছে ভিটেটুকু।

----------

দিন কেটে যাচ্ছে। এরমধ্যে হঠাৎ একদিন খুঁশিতে ফেটে পড়তে হল। জামায়াত-মুসলীম লীগের লোকেরা যখন অনবরত বলছে, ‘দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা নেই। পাকিস্তানবিরোধীরা নিশ্চিহ্ন হয়ে  গেছে। ঠিক তখনই ঘটল এই ঘটনা।

রেডিওটা নাড়াচাড়া করছিলাম। অবশ্য বাবার নির্দেশ মত এটা করতেই হয়। কখনও রেডিও পাকিস্তান ঢাকা, কখনও বিবিসি লন্ডন, কখনও ভয়েস অব আমেরিকা, কিংবা আকাশবাণী কোলকাতা ধরতে হয়। সেন্টারগুলো মুখস্ত হয়ে গেছে। লক্ষ্য করছিলাম, আকাশবাণী এবং বিবিসিতেস্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র উদ্ধৃতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রচার শুরু হয়েছে। পাকিস্তানপন্থীরা এসব খবরকে ডাহা মিথ্যা কথা বলে প্রচার চালাচ্ছিল। সেই  থেকে প্রতিদিন স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র খুঁজে বেড়াই। কিন্তু কোন খোঁজ পাইনা। এদিনও এমনই ভাবে নব্  ঘোরাচ্ছিলাম। হঠাৎ অন্ধকারে আলো খুঁজে পাওয়ার মত স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র পেয়ে গেলাম। বিদ্যুৎ চমকের মত চমকে দিল ভিতরটায়। বাবাসহ অনেকেই এলেন। এক সময় সবাই শুনতে পেল স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের  ঘোষণা। নব ঘোরাতেই আরও স্পষ্ট হল। বেতার থেকে একের পর এক প্রচার করা হল, মুক্তিবাহিনী গঠনের কথা, যুদ্ধের কথা, আর পাকবাহিনীর নাস্তা নাবুদ হবার কথা। সবাই অবাক হয়ে শুনল সব। নিজেদের চোখ কানকে যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। স্বাধীনবাংলা বেতারের অস্তিত্ব যেন স্বপ্নের ঘোরে দেখা হচ্ছে। অবশ্য নিরবতা ভেঙ্গে মন্তব্য করল বাবার এক পরিচিত জন, ‘ওটা ইন্ডিয়ার সেন্টারই হবে, স্বাধীনবাংলার নামে চালাচ্ছে।

স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র উদ্ধার করায় এলাকার তরুণ যুবকদের মাঝে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বৈঠকখানার সামনে লোক জমায়েত হতে লাগল। যেন হাট বসে যাচ্ছে। তরুণ যুবক বৃদ্ধ সবাই আসে। স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র শোনার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করে। সেন্টার চালু হয়। সবাই কান পেতে শোনে। ধীরে ধীরে শ্রোতাদের চোখ মুখ নতুন করে চকচক করে ওঠে। স্বাধীনবাংলা বেতারে শেখ মুজিবেরবজ্রকণ্ঠ বিস্ফোরণের মত সবাইকে উত্তেজিত করে তোলে।ভায়েরা আমার, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, তবু এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। জয় বাংলা।

উপস্থিত শ্রোতারা নতুন জীবনের প্রেরণায় জেগে ওঠে। সবার চোখে মুখে বিজয়ের অভিব্যক্তি। অবশ্য ঠিক এর বিপরীত দৃশ্যও চোখে পড়ে। জামায়াত মুসলিম লীগ সমর্থকদেরকে হতাশ আর বিরক্ত দেখা যায়। তবে তারা চুপ করে থাকে। গম্ভীর হয়ে শুধু শোনে সব। স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে বেজে চলে, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়। হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়ই। কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে, নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়। জয় বাংলা বাংলার জয়।

---------------

বেশ অনেকগুলি সপ্তাহ কেটে গেল। আমাদের জীবন যাপনের ধারা পাল্টে গেছে। দারুণ অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। সবারই এক অবস্থা। পালিয়ে আসা মানুষগুলোর জমানো অর্থ সম্পদ ফুরিয়ে গেছে। অধিকাংশ পরিবারের প্রধানরাই চাকুরে। এখন তাদের চাকরি নেই। মিলিটারির ভয়ে কেউ চাকরিতে যোগ দেননি। বসে বসে  খেয়ে সবার অর্থ কড়ি ফুরিয়ে গেছে। নগদ টাকা ফুরিয়ে যাবার পর পরিবারের জিনিসপত্র বিক্রি করে খরচ চালান হচ্ছিল। এখন সে জিনিসপত্রও অবশিষ্ট নেই। সব হারিয়ে এখন সবাই সর্বহারায় পরিণত হয়েছে। অখাদ্য, কুখাদ্য এখন বেঁচে থাকার অবলম্বন। কেউ পাটের পাতা সিদ্ধ করে খায়, কেউ কচু গাছ খায়, কেউ-বা জংলী লতাপাতা ছিঁড়ে রান্না করে খায়। ভাতের বদলে ডাল, গম, জব সেদ্ধ খাওয়া শুরু হয়েছে।

আমাদের অভাব দেখা দিল খাদ্য, অর্থ আর চিকিৎসায়। বাজার করা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তিন বেলা খাবারের বদলে দুবেলা শুরু হয়েছে। এক সময় দুবেলার পরিমাণও হ্রাস পেতে পেতে করুণ হয়ে উঠল। বাবা একদিন কুড়িয়ে পেলেন অনেকগুলি ভিটামিন ক্যাপসুল। প্রোটিন ক্যালরীর অভাব মিটাতে আমাদের ওগুলো খেতে হল।

খাদ্যসংকট কিছুটা কমানোর জন্য একদিন একটা উপায় বের হল। বাবার সঙ্গে প্রতিদিন বিকেলে ছিপ বড়শি নিয়ে ইছামতি নদীতে যাওয়া শুরু হল। নদীতে প্রচুর মাছ। টাকি, মাগুর, শিং, কাতলা, বাম, শৈল মাছ ধরা পড়তে লাগল ছিপে। এতে খাদ্য সংকট কমলো। একদিন বিকেলে মাছের বদলে নতুন জিনিস পেলাম। পানিতে ফাতনার উপর নজর রাখতে বলেছেন বাবা। ফাতনা ডুবে যেতেই টানা শুরু করলাম। ওদিকে বাবার ছিপের ফাতনাও ডুবিয়ে নিয়েছে। বাবা টানছেন, বড়শি উঠছে না, আমারটা টানছি বড়শি উঠছেনা। বড় কোন কিছুতে টেনে নিয়েছে এগুলি। তাই অনেক টানার পরও কিছু হল না। সুতো ছিঁড়ে যাবার অবস্থা হল। অবশেষে বাবা পানিতে  নেমে হাতড়িয়ে দেখলেন। বড়শি দুটো মাটির নীচে গর্তে চলে গেছে। বাবা বললেন, ‘বাম মাছ অথবা সাপে টেনে নিয়ে গেছে। তিনি কোদালের জন্য আশ পাশে খুঁজতে গেলেন। তারপর কোদাল এনে পানিতে নেমে গর্ত খোঁড়া শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বড়শির সঙ্গে উঠে এল দুদুটো বিশাল বাম মাছ আকৃতির অদ্ভুত মাছ। লম্বায় আমার দ্বিগুণ এবং মোটায় আমার পায়ের সমান। লোকজন জড়ো হয়ে গেল। কেউ কেউ বলল, ‘এটা মাছ নয়।  কেউ বলল, ‘এটা মুসলমানেরা খায় না, হিন্দুরা খায়। বাবা মাছ 'টো দিয়ে দিতে চাইলেন, কিন্তু কেউ তা নিল না। ফলে বাধ্য হয়ে দুটো বাড়িতে নিয়ে আসা হল। বাবা বললেন, ‘খাদ্যের খুব অভাব। হারাম হালাল দেখে লাভ নেই। এগুলোই খেতে হবে। রান্না করলে অন্ততঃ ১০/১৫দিন খাওয়া চলবে। মা খুব আপত্তি করলেন। কিন্তু চাপের মুখে রান্না করতে বাধ্য হলেন। রান্নার পর বাবা প্রথম দিন খেলেন, তারপরে আর খেলেন না। আর কেউ  খেল না বলে আমি একাই খেলাম। দারুণ সুস্বাদু, ঠিক কসানো বাম মাছের মত। অনেকদিন ধরে অবিরাম খেয়ে  গেলাম সেই মাছ।

-------------

আরও দিন কেটে গেল। পরিস্থিতিও বদলে যেতে লাগল। স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র জানাচ্ছে, পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা আরও দুর্বার হয়েছে।

এদিকে মিলিটারিদের তৎপরতাও আরও বর্বর হয়ে উঠছে। এমনিতেই প্রতিরাতে শহরের দিক থেকে গুলির শব্দ  শোনা যায়। ফাঁকা গুলি। আমাদের সিঙ্গা গ্রামের উপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে যায়। রাতের বেলা ওগুলোকে ঝাঁক ঝাঁক আলোর পিন্ডের মত দেখায়। যখন গুলি হয়, রাতের নিস্তব্ধতা তখন গুড়িয়ে যায়। ঠা ঠা ঠা ঠা ঠা ঠা শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা পরিবেশ। আকাশ-বাতাস গুম গুম করতে থাকে। ধরনের গুলির আওয়াজ দিনে দিনে বাড়ছেই। দিন আগেও রাতের বেলা হঠাৎ হঠাৎ গুলির শব্দ হত, এখন ঘন ঘন হয়। ইদানীং সারারাত ধরেই  থেকে থেকে গুলি চলছে। কেউ কেউ বলল, ‘মুক্তি বাহিনীর ভয়ে মিলিটাররা ফাঁকা গুলি চালায়। গুলি চালালে ওদের সাহস বাড়ে। এভাবে আরও কিছুদিন কেটে যাবার পর, দিনের বেলাতেও গুলির শব্দ হতে লাগল

---------------

খবর আসছে, মুক্তিবাহিনীকে মোকাবিলার জন্য পাকবাহিনীর সহায়তায় শহরে রাজাকার, আল বদর, আল শামস শান্তি কমিটি গঠন শুরু হয়েছে। সবের উদ্যোক্তা জামায়াতে ইসলামী মুসলিম লীগের নেতারা। এইসব বাহিনীতে তাদের দলের লোকজনকে নেয়া হচ্ছে। মুক্তিবাহিনী অর্থাৎ তাদের ভাষায়ভারতীয় সন্ত্রাসীদের খোঁজ খবর সংগ্রহ করার জন্য তারা শহর গ্রামে শান্তি কমিটি গঠন শুরু করেছে।

-----------

দিন যাচ্ছে। যত যাচ্ছে পরিস্থিতি ক্রমে তত খারাপ হচ্ছে। সিঙ্গা গ্রামে আশ্রয় নিয়ে আমরা সবাই নিরাপদ মনে করছিলাম। কিন্তু এদিকেও বিপদ ঘনিয়ে আসতে লাগল। প্রায়ই খবর আসছে, মেয়েদের সন্ধানে মিলিটারিরা হন্যে হয়ে উঠেছে। শহরে কোন মেয়ে না পেয়ে তারা এখন গ্রামে নামতে শুরু করেছে। সিঙ্গার পূর্ববর্তী গ্রামগুলোতে তারা এরইমধ্যে হানা দিয়েছে। ঐসব গ্রাম থেকে অনেক মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে। এসব মেয়েদের বয়স কারও ১০, কারও ১২/১৩, কারও-বা ১৫ থেকে ৩০। নির্বিচারে পশু শিকারের মত তাদের ধরা হচ্ছে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর অবিরাম ধর্ষণ চালানো হচ্ছে। জামায়াত মুসলিম লীগের লোকেরা খোঁজ এনে দিচ্ছে-  কোন কোন এলাকায় মেয়ে পাওয়া যাবে। মিলিটারিরা সেইমত গ্রামে হানা দিচ্ছে।

সিঙ্গা স্কুল থেকে ডিগ্রি কলেজ পর্যন্ত এলাকায় যে মেয়েগুলোকে মিলিটারিরা পেয়েছে, তাদের সবাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন ওই দিকের মেয়ে ফুরিয়ে গেছে। তাই ওরা আরও ভিতরের দিকে নজর দিয়েছে। আমাদের এলাকার উপরও নজর পড়েছে। অবস্থায় শহর সংলগ্ন গ্রামগুলো থেকে নতুন করে লোক পালানো শুরু হয়েছে। যারা আমাদের এই সিঙ্গা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল, তারাও একে একে পালাতে শুরু করেছে। আমরাও আতংকিত হয়ে উঠেছি। বাবা স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে, মিলিটারিরা বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। এর ফল ভাল হবে না।

-------------

একদিন দুপুর। হঠাৎ আমাদের গ্রামে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। মেয়েরা সব দিশেহারার মত ছুটছে। বাজ পাখির তাড়া খাওয়া মুরগীর মত গাছ-পালা-ঝোঁপ-ঝাড় ভেঙ্গে সবাই ছুটছে। পাশেই নাকি মিলিটারি হানা দিয়েছে।  মেয়েদের খোঁজে বেরিয়েছে ওরা। প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে আমাদের গ্রামে। আমাদের আশ-পাশের বাড়ির  মেয়েরা ছুটছে, চিৎকার করছে, কেউ কেউ মুখ থুবড়ে পড়ছে আর ছুটছে। অল্প সময়ের মধ্যে গ্রামটি হয়ে গেল বালিকা, কিশোরী যুবতী শূন্য। সবাই উত্তরের গ্রামের দিকে চলে গেছে। যারা একটু বয়সী কিংবা ছুটতে পারেনা, এমন মহিলারা শরীরে কাদা মাটি ময়লা লেপতে শুরু করলো। কালি-ঝুলি মেখে সবাই পেতিœ মত হয়ে গেল। বিশ্রি আর নোংরা মেয়েদের প্রতি নাকি মিলিটারিরা তেমন একটা নজর দেয় না। ময়লা মাখা এইসব মহিলারা কেউ  খড়েরর গাদায়, কেউ জঙ্গলে, কেউ গর্তে কেউ খাটের নিচে লুকিয়ে পড়লো। কেউ-বা গরুর গোয়াল ঘড়ে ঢুকে গায়ে গোবর মেখে গরুর সঙ্গে মিশে রইলো। তারপর গ্রামটা নিঝুম হয়ে গেল। মুহূর্তেতই চারদিন সুনসান হয়ে পড়লো। বাইরে থেকে মনে হবে, গ্রামে যেন একটা জীবিত প্রাণীও নেই।

অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও মিলিটারি এলো না। নিঃসন্দেহে ভাগ্য ভাল। একজন খবর দিলো, ছয়-সাতজন মিলিটারি পূবের গ্রামে তল্লাশি চালিয়ে চলে গেছে। কোন মেয়ে না পেয়ে ওরা ওরা হতাশ হয়েছে। কিরণদের জন্য খুব চিন্তা হলো। ওরা গ্রামেই ছিল। অবশ্য পরে খবর এলা- ওরা আগেই ওই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল। [চলবে]

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ