স্মৃতির জানালা : ছয়
আবুল হোসেন খোকন
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ। কাল্পনিক ছবিটি শরীফ, রুম, জেসমিন, তুহিন, আজীজ, আল আমীনদের বাড়ির সামনে খেলার ছোট্ট জায়গাকে কেন্দ্র করে। পাশের ঘরটা মেসের মত। সেখানে জায়গীর থাকার মত করে ওদের কয়েক স্বজন থাকে। তাদের মধ্যে সুযোগ পেলে বুলবুল (আমরা ডাকতাম বুলবুল ভাই বলে) নামে একজন আমাদের সঙ্গে খেলাধুলায় মাতব্বরি করতো। সে বয়সে বেশ বড় এবং শরীফের ঘনিষ্ট আত্মীয়। আমরাও তাকে মেনে চলতাম। এই মেস ঘরটার বারান্দা ছিল আমাদের আড্ডা দেওয়ার একটা জায়গা। তা ছাড়া আমাদের মধ্যে যারা একসঙ্গে জড়ো হওয়ার জন্য আগেভাগে হাজির হতো, সে এই বারান্দায় অপেক্ষা করতো।
সময়টা তখন আন্দোলনের। থ্রিলার, ডিটেকটিভ, অ্যাডভেঞ্চার বই পড়ার কারণে আমার মধ্যে এক ধরণের উৎসুক্য বা অনুসন্ধানী মানসিকতা কাজ করতো। খেলাধুলা এবং আড্ডার মধ্যেও এর প্রভাব থাকতো। স্কুল থেকে মিছিলে যাওয়া, এলাকার মধ্যে কোন মিছিল ঢুকলে তাতে তাল মেলানো, বড়রা কে কি আলাপ করে সেগুলো কান পেতে শোনা, দল বেধে খেলার সময় মিছিলের স্লোগান আওড়ানো, দেওয়াল লেখার চেষ্টা করা, পোস্টার পেলে সেগুলো সাঁটানো, বড়রা যখন রেডিওর খবর শুনতেন এবং নিজস্ব মতামত দিতেন- সেগুলোও শোনা ছিল উৎসুক্য মানসিকতার অংশ। বলা যায় কচি বয়সেই পেকে যাওয়া অবস্থা।
আগেই বলেছি, আমাদের এলাকা ছিল নকশাল অধ্যুষিত। বাড়ি থেকে ডিগ্রি কলেজের দিকে তেলকল মালিক আবদুল হামিদের বাড়ি। তাঁর ছেলে বাচ্চু ভাই নকশালদের একজন নেতা। সেই বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ি হয়ে পশ্চিমে বিহারী আশরাফদের বাড়ি। তারাও নকশাল দলের কর্মী। রাস্তা বা দেওয়ালে ওরাই পূর্ব বাঙলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-এর দেওয়াল লিখন লিখতো বা চিকা মারতো। পাড়ার মধ্যে যারা মুসলমান মুরব্বি- তাদের বেশির ভাগই মুসলিম লীগ বা জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক ছিলেন। আমার বাবা, শরীফের বাবা, কয়েস-মনজুর বাবা ছিলেন এই দলে। আর কিরণের বাবা ছিলেন আওয়ামী লীগের পক্ষে। তবে নকশালদের দাপট থাকায় পাড়ার মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থক কারা- তা সহজে বোঝা যেতো না।
ওই সময় ভোটের কথা মনে পড়ে। যেটা ৭০-এর নির্বাচন। বাবার সমর্থদের পাঠিয়ে দেওয়া রিকশা এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। বাবা সাইকেল নিয়ে ভোট দিতে বের হন। আর মাকে আমার সঙ্গে রিকশায় তুলে দেন। রিকশা আরএম একাডেমি ভোট কেন্দ্রে নিয়ে যায়, তারপর কিছু মহিলা মাকে ভোট দেওয়াতে নিয়ে যায়। কয়েস, শরীফদের বাবা-মাও এইভাবে ভোট দেন। তখন অবশ্য অতো বুঝিনি। তারপরও যেটেুকু বুঝেছি তা হলো- তারা দাড়িপাল্লা আর হারিকেন মার্কায় ভোট দিয়েছেন। এ মার্কার একটা হলো জামায়াতের ইসলামী এবং আরেকটা মুসলিম লীগের মার্কা। তখন আরেকটা দল ছিল যেটাকে ভাষাণী ন্যাপ বলা হতো। তারা ভোটের মাঠে ছিল না। এটা বুঝেছি এডওয়ার্ড কলেজের বটতলার সভা থেকে। সেখানে ছাত্র ইউনিয়নের সভা থেকে বলা হয়েছে- ভোটের বাক্সে লাথি মারো, পূর্ব বাঙলা স্বাধীন করো। এর মানে হলো নকশাল, ভাষাণী ন্যাপ, পূর্ব বাঙলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল), ছাত্র ইউনিয়ন ছিল ভোটের বিরুদ্ধে। বাকি দলগুলো ভোট করছিল।
ভোটের পর রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ এক চেটিয়াভাবে ভোটে জয়লাভ করে। স্বাভাবিকভাবেই এলাকার নকশালদের উপর বড় মাপে চাপ তৈরি হয়। যার কারণে পরিস্থিতি সংঘাতের পথে চলে যায়। তবে এসব থেকে আমরা দারুণ উত্তেজনা অনুভব করতে থাকি। আমাদের মধ্যে উৎসুক্য বেড়ে যায়। আমরা বুঝে না বুঝে নানা তৎপরতায় মাথা গলাতে থাকি।
আমরা কী কী করতাম তার কিছু ঘটনা ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ঘাতকের পদতলে বসবাস’ গ্রন্থে তুলে ধরেছি। সেই গ্রন্থ থেকেই এখানে অংশবিশেষ যুক্ত করছি।
আমাদের একটা ক্ষুদে দল। সবার ভাবনা- আমরা একদিন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। বেশ ঝাঁঝালো স্বপ্ন। স্বপ্নটাকে আমরা কাছে টানি, হাতের মুঠোয় নিয়ে আসি। স্বপ্নটা যেন হয়ে যায় পুতুল খেলা। আর প্রতিদিন চলে তারই মহড়া। কিরণ, করিম, সেলিম, শরীফ, কয়েস, মান্নু, রুম, জামাল, জাকির, আজীজ, হাকিম, শফি, সুবির, লাল, চন্ডি, রবিউল হল দলের সদস্য। বাড়ি থেকে ডিগ্রি কলেজের দূরত্ব এক ফার্লং। বিকেল হওয়া মাত্রই দলের সদস্যরা পৌঁছে যায় সেখানে।
একটি পুকুর। পূবে পাশাপাশি দু’টি একতলা দালান। পশ্চিমটা ফাঁকা। কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ঠিক উত্তর-পূর্ব কোণায় তিনতলা ডিগ্রি ভবন, উত্তরে আরেকটি একতলা। এখানেই- পশ্চিম কোণায় ইটের পাহাড়, সারিসারি সাজানো। নতুন ভবন তৈরির জন্য ফেলে রাখা হয়েছে বহুদিন। জংলী গাছ আর আগাছায় ঢেকে গেছে প্রায় সব। এটাই আমাদের রণাঙ্গন ।
লাঠি আর কাঠের ভাঙ্গা টুকরো হলো আমাদের বন্দুক। খেলার নাম 'ফাইটিং মার কুক’। একজন বিচারকের মাধ্যমে দল ভাগ হয়। বিচারক গলা চিঁড়ে ‘কু-উ-উ’ করে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে দলের সবাই ছিটকে যায়, ইটের ফোঁকরগুলোতে গা ঢাকা দেয়। চিকন ফাঁক গলে গলে চলে যায় এক একজন অনেক গভীরে।সহজে কাউকে খুঁজে পাবার জো-টি নেই। তারপর বিচারকের দ্বিতীয় দফা সংকেত 'কু-উ-উ’। শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। গেরিলা কায়দায় গোপন স্থান থেকে সতর্ক বিড়ালের মত বেরিয়ে আসা, তারপর সম্মুখে শত্রু পক্ষের কাউকে দেখা মাত্র 'ঢিশুম’। হাতের বন্দুক বাগিয়ে ধরে মুখ থেকে ঢিশুম শব্দ বেরোনর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষ খতম হয়ে যায় এবং আপনা-আপনি সে উঠে চলে যায় বিচারকের কাছে। হয়ে যায় দর্শক। এদিকে আরও যুদ্ধ চলে, শত্রু নিধন হয়। এক সময় এক পক্ষের সবাই শেষ হয়ে যায়। অন্য পক্ষের যে ক’জন বেঁচে থাকে- তারাই হয় বিজয়ী। প্রতিদিন আমাদের এই মহড়া চলে। এ যুদ্ধ দেখে থমকে যায় পথিক। বিস্ময়ে চেয়ে দেখে। বলে, 'বা বেশ বেশ! অন্যদের উদ্দেশ্যে বলে, 'ঠিক দেখে নিও, এরাই হবে একদিন যোদ্ধা।’
![]() |
কাল্পনিক ছবি |
পাড়াটা মজুমদার পাড়া বলে পরিচিত। পাবনা শহরের রাধানগর গ্রামে এ পাড়া। এক সময় পাড়ার বেশ নাম-ডাক ছিল। হিন্দু জমিদারদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা বাস করতো। সাধারণের মধ্যে পালদের বসতি ছিল। এই পাল এখনও আছে। জমিদারের প্রাসাদ নেই; কিন্তু বাড়ি-ঘর-পুকুর আছে। এ সব কিছুকেই বলা হয় মজুমদার বাড়ির অবশেষ। আর পাল বলতে এখন যে টিকে আছে, তার নাম হারাণ পাল।
প্রতিমা বা ঠাকুর বানানোই তাঁদের কাজ। আমাদের বাড়ির শ’দুয়েক গজ দূরে উত্তর-পূর্ব কোণায় বাড়িটা। বাড়ির সবাই প্রতিমা বা ঠাকুর বানাতে ওস্তাদ। এই ঠাকুর এখান থেকে শুধু পাবনা নয়, গোটা পূর্ব পাকিস্তান এবং ভারতে পর্যন্ত সরবরাহ হয়। শুনেছি উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বায়না আসে ঠাকুরের।
আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে রথঘর। রথের মেলা শুরু হলে কালো তেকোণা ঘর থেকে টেনে বের করা হয় ওই রথ। সারা বছর ঘরেই আবদ্ধ থাকে ওটা। এই রথঘর থেকে পশ্চিমে কিছুদূর ডানে ছোট পথ চলে গেছে উত্তরে। খানিক পরই তেমাথা। পূব-পশ্চিম কোণার বিরাট জোংলা বাড়িটা আমাদের। ঠিক পিছনেই হাজী কুটির। সেখানে থাকে বন্ধু শরীফ, রুম, আজীজ। ওদের বাড়ির উত্তর মুখে চলে গেছে আরেকটি সরু পথ। এই পথের দু’ধার দিয়ে কয়েস, মনজু, চন্ডি, করিম, জামাল, জাকিরদের বাড়ি। এই উত্তরমুখো পথটি মিলেছে পূব-পশ্চিম মুখি আরেকটি পথে-ঠিক ইছামতি স্কুলের সঙ্গে।
এই ইছামতি স্কুলের মাঠে বড়দের আড্ডা। দেশের পরিস্থিতি অন্যরকম। আড্ডায় সবকিছু আলোচনা হয়। বিকেলে সবাই দলে দলে আসে। দেশের খবর নিয়ে বৈঠক করে- কী করা হবে সিদ্ধান্ত নেয়। একেকজন বিভিন্ন জায়গার খবরগুলো পরিবেশন করে। এসব শোনার জন্য মাঠে লোক ভরে যায়। বৈঠক-আলোচনা ছাড়াও এ মাঠে চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। বন্ধু সেলিমের বড় ভাই সানাউল্লাহ এই প্রশিক্ষণের ড্রিল মাস্টার। একদল একদল করে ছেলেদের নিয়ে মার্চ পাস্ট করানো হয় প্রতিদিন। যুদ্ধের জন্য তৈরি করা হচ্ছে ছেলেদের। আমরা বড্ড ছোট বলে হা করে তাকিয়ে দেখি। চিৎকার করে সানা ভাই বলেন, 'লেফট রাইট লেফট, লেফট রাইট লেফট’। আমাদের কানে শুনি 'হাফ হাইট হাফ, হাফ হাইট হাফ’। তালে তালে পা পড়ে সবার, পাথরের মত শক্ত ওদের মুখ। হাতের লাঠিগুলো রাইফেলের মত ঝুলিয়ে বীরদর্পে এগিয়ে যায় ওরা। বড্ড ভাল লাগে। মুক্তিযোদ্ধা হতে ইচ্ছে করে।
কিরণের বাবার নাম জয়নাল পোদ্দার। মাঝে মাঝেই তিনি আসেন স্কুল মাঠে। যুদ্ধপ্রস্তুতির বিভিন্ন আয়োজন দেখেন এবং নিজের মত কিছু পরামর্শ জারি করেন। তিনি সবাইকে ঠিকমত তৈরি হতে বলেন। স্কুলের পিছনের দিকে বাস করেন আবু মিয়া বলে আরেকজন বড্ড রগচটা লোক। তিনিও প্রায়ই উপদেশ-নির্দেশ দেন।
আজ বিকেলটার ঘটনা অন্য রকম। স্কুল মাঠ ভর্তি লোক। জনসভার মত ছড়ানো ছিটানো সবাই। অনেক জায়গায় থোকা থোকা জটলা। এই জনসভার এ-মাথা ও-মাথা পর্যন্ত নেচে বেড়াচ্ছে শক্ত শক্ত খবর।
একটি জটলায় আবু মিয়া ক্রুদ্ধ চোখ মুখ পাকিয়ে বলছেন, ‘পাঞ্জাবীরা হামলা শুরু করেছে। গাছ ফেলে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দাও। গোলার (এডওয়ার্ড কলেজের মোড় বটতলাকে বলা হয় গোলা) রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে বন্ধ করো। হাকিমুদ্দির স’মিল থেকে গাছের সব গুঁড়ি বের করে নাও।’ তিনি পশ্চিমের ডাকবাংলো সড়ক দেখিয়ে বললেন, 'এই পথে মিলিটারীরা আসতে পারে, পথ বন্ধ করে দাও। দরকার হলে পথ কেটে কেটে গর্ত করে রাখো।’ আবু মিয়ার নির্দেশ মত অনেকে চলে গেল। একেক জটলায় একেক খবর। কোথাও খবর, 'মিলিটারীরা গুলি চালিয়েছে।’ কোথাও খবর, 'অনেক বাঙালি মারা গেছে।’ আবু মিয়াকে হঠাৎ ছুটাছুটি করতে দেখা গেল। চিৎকার করে তিনি বলছেন, 'তীর-ধনুক বানাতে হবে। হারামজাদাদের দেখামাত্র খতম করে দিতে হবে।’ আরেক দিকে মার্চ পাস্টের নেতা সানাউল্লাহ ভাই বলছেন, 'লাঠি-ফালা-ছোরা যার যা আছে, তাই নিয়ে তৈরি হও সবাই। আজ রাতেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।’
জনসমাবেশটা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। যেন ক্রোধের বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল সবার মাঝে। পূবের রাস্তায় একজনকে ঘিরে বিরাট দঙ্গল এগিয়ে আসছে। দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে একজন আসছেন। তাকে ঘিরে অন্য সবাই কথা বলছে। যিনি আসছেন তার নাম আফতাব। তিনি বাঙালি মিলিটারী। চট্টগ্রামে ছিলেন, পালিয়েছেন। কয়েকদিন ধরে পায়ে হেঁটে হেঁটে চট্টগ্রাম থেকে পাবনা পৌঁছেছেন। স্কুলের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণায় বন্ধু সেলিমের বাড়ির পাশেই তার বাড়ি। ধরাধরি করে সবাই তাকে নিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে পা নাকি ব্যথা হয়ে ফুলে গেছে। যাবার সময় তিনি সবাইকে লক্ষ্য করে বলে গেলেন, 'যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমরা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সবাই পাকিস্তানি ক্যাম্প ছেড়ে চলে এসেছি।’
(চলবে)





0 মন্তব্যসমূহ