কাল্পনিক দৃশ্য
স্মৃতির জানালা : নয়
৩০ মার্চ ১৯৭১ : সকাল আটটা থেকে নয়টা। হঠাৎ পরিবেশ পাল্টে দিল একটি জঙ্গী বিমান। গোটা আকাশ যেন মুহূর্তে চিরে গেল। প্রচন্ড গর্জনে ছুটে এল পাকিস্তানী ঐ জঙ্গী বিমান। চারদিকের সবকিছু কেঁপে উঠল। এমনই সময় আরও ভয়ংকর অবস্থা তৈরি করে বিমানটি গুলি বর্ষণ শুরু করল। বড়রা আমাদের মাটিতে শুয়ে পড়তে নির্দেশ দিলেন। অনেকে দৌঁড়ে আশ্রয় নিলেন বাড়ি-ঘরে। ঠা ঠা ঠা ঠা করে গর্জে চলেছে আকাশ। মেঘের গর্জনের মত গুম গুম করছে চারদিক। অবশ্য এখনও বিমানটি চোখে দেখতে পাইনি আমরা। ফাঁকা জায়গা থেকে সতর্ক চোখে খুঁজে বেড়াচ্ছি ওটাকে। এত গর্জন হচ্ছে যে, কোন দিক থেকে কোন দিকে শব্দটা যাচ্ছে ঠাহর করা যাচ্ছে না। তাছাড়া বিমান হামলা হয়েছে শহরে। আমরা অন্ততঃ আড়াই মাইল দূরে রয়েছি।
অনেকক্ষণ ধরে শুধু বিমানের গর্জন আর গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। এক সময় উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপরই দেখতে পেলাম বিমানটিকে। সাদা ছোট্ট মত বিমান। আমাদের মাথার উপর দিয়ে সাঁ করে চলে গেল। শহরের দিক থেকে কিছুক্ষণ পর আবার ওটা ছুটে এল মাথার উপর। আবার গেল, আবার এল। বৃত্ত তৈরি করে ঘুরছে ওটা। এখন আর গুলি হচ্ছে না। আমাদের সাহস বেড়ে গেল। দাঁড়িয়ে বিমান দেখতে লাগলাম। জেসমিন, আজীজ, তুহিন, রুম সবাই ছুটে এল। বড়রাও সাহস করে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।
এর মধ্যে হঠাৎ আবার বিমানটি গুলি বর্ষণ শুরু করল। মেশিনগানের শব্দে কান পাতা দায় হয়ে গেল। আতংক ছড়িয়ে পড়ল বড়দের মাঝে। কে যেন বলল, ’একটা বোমা ফেললেই গোটা শহর ধ্বংস হয়ে যাবে। এখানে থাকা নিরাপদ নয়। তাড়াতাড়ি সবাইকে পালাতে হবে।’
বিমানটি এক সময় চলে গেল। বড়দের মাঝে রেখে গেল পাহাড় সমান আতংক। এর মধ্যে পাখা মেলতে লাগল ভয়ের গুজব। কেউ কেউ বলল, ’মিলিটারী হত্যার প্রতিশোধ নিতে এবার আরও বিমান আসবে। ওরা বোমা ফেলে সব মানুষ মেরে ফেলবে।’ অন্য একজন বলল, ’আমি জানি এ বিমানটি সব কিছু দেখে শুনে খোঁজ নিয়ে গেল। এরপর ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান আসবে। আমি সেনা বাহিনীতে চাকরি করেছি বলে নিয়ম কানুন জানি।’ অনেকেই বলল, ’'এখানে আর নিরাপদ নয়। প্রাণে বাঁচতে চাইলে সবাই এখনই পালিয়ে যান।’
‘বোমা মেরে সবাইকে হত্যা করা হবে’- এই আতংকটি বেশ জেঁকে বসল। বড়দের মাঝে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। শরীফের বাবা বললেন, ’এখনই এখান থেকে চলে যেতে হবে।’ আমার বাবা বললেন, ’যাব কোথায়? ওরা গ্রামগুলোও তো ধ্বংস করবে এখন।’ খানিক পর দেখলাম, বড়রা সব পরামর্শে বসে গেল। শেষ পর্যন্ত বড়দের সিদ্ধান্ত হল- এখনই এখান থেকে চলে যেতে হবে।
যেমন কথা তেমন কাজ। শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। ছোটাছুটির মধ্যে তিনটা গরুর গাড়ি যোগাড় হল। আর দেরি না করে সবাইকে দ্রুত ওঠান হল সেই গাড়িতে। তারপর এক সময় রওনা হল গাড়ি। খুব দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনার মত আমরা সবাই চললাম আরও গহীন গ্রামের দিকে।
বাড়ি-ঘর-মাটি-মানুষ-বন্ধু-বান্ধব সবাইকে ফেলে চলেছি আমরা অজানার পথে। শুধু আমরা নই, হাটভাঙ্গা মানুষের মিছিলের মত ছুটছে সবাই। ধনাঢ্য লোকের বউ-বাচ্চারা পড়িমরি করে ছুটছে। পায়ে হেঁটে চলেছে বেশির ভাগ মানুষ। এই বিপদের দিনে যানবাহন পাবেইবা কোথায় ওরা? আমরা পেয়েছি নেহায়েৎ ভাগ্যের জোরে।
গরুর গাড়ি চালকের পেছনে বসার জায়গা হয়েছে। পাশে জেসমিন, তুহীন আর আল আমিন। গাড়ি চলছে ধীরে। চারপাশের অনেক দৃশ্য ছাড়িয়ে চলেছি আমরা। এ পরিবেশে আমাদের মুখে খই ফোটার কথা। অথচ কথা বলছি না কেউ। শুধু তাকিয়ে আছি। প্রকৃতির স্বাভাবিকতাকে ভেঙে তছনছ করে দিয়ে সবকিছু কেমন অন্য রকম হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তারাও পর্যবেক্ষণ করছে- দেশটায় ঘটছে কী? তাদের দৃষ্টির উপর জলজ্যান্ত আতংকের প্রতিচ্ছবি হয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের সামনে শত শত মানুষের চলমান মিছিল, পিছে মিছিল। সবাই চলেছি একই পথে।
৬-৯ এপ্রিল ১৯৭১ : প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আমরা আবার শহরে ফিরে এসেছি। পাবনা এখন স্বাধীন। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে সবকিছু চলছে। এরমধ্যে অস্ত্র সংগ্রহের একটা অভিযান চলান হয়েছে। লাইসেন্স করা যত অস্ত্র ছিল, সব মুক্তি বাহিনীরা উঠিয়ে নিয়েছে।
আমাদের বাড়ির পশ্চিমে ফরহাদদের বাড়ি। ওরা বিহারী। ওদের দোনলা বন্দুক ছিল। এখন ওটা মুক্তিবাহিনীর কাছে। ফরহাদদের কারও কোন ক্ষতি করা হয়নি। ওরা এখন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রেখে চলছে। ফরহাদের বড় ভাইয়েরা সব নকশাল বা পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পাটির (এমএল) সদস্য। টিপু বিশ্বাস তাদের নেতা। কিন্তু এখন ফরহাদরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আসায় কেউ বিপদে পড়েনি।
শহরে মাঝে মাঝেই পাকিস্তানী বিমান হানা দেয়। প্রচন্ড গর্জনে ছুটে আসে, তারপর বৃষ্টির মত গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে চক্কর দেয়। নিচে মুক্তিযোদ্ধারা রাইফলে থেকে পাল্টা গুলি চালায়, তখন বিমান চলে যায়। হামলার সময় আমরা পরিখাগুলোতে লুকিয়ে পড়ি।
আজও বিমান হামলা হয়ে গেছে। বিকট শব্দে মেশিনগান থেকে গুলি চালিয়েছে। তারপর এক সময় চলে গেছে। পরিখা থেকে বেরিয়ে মহিদুল ভাইদের বাড়ির দিকে গিয়ে শুনলাম, দুটি গুলি আঘাত হেনেছে। একজন গাছের নিচে পালিয়েছিল। সেই গাছের মাথার দিকে একটি গুলি আঘাত হেনেছে। এতে গাছের মোটা ডাল ভেঙে নীচে পড়ে গেছে। অন্য গুলিটি মহিদুল ভাইদের টিনের চালা ফুটো করে মেঝেতে ঢুকে গেছে। মহিদুল ভাইরা মাটি খুঁড়ে গুলিটি বের করলেন। সবাইকে ওটা দেখাতে লাগলেন। এরমধ্যে আরও পশ্চিমের ’ঘড়িওয়ালা বাড়ি’র মোখলেসুর রহমান মুকুল ভাই এলেন। তাঁর হাতে টুটুবোর রাইফেল, গায়ে খাঁকি কাপড়ের সবুজ পোশাক, মাথায় ফেল্টক্যাপ। মুকুল ভাই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি গুলিটি হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে বললেন, ’এটা হ্যাভী মেশিনগানের গুলি।’
পাড়ায় এখন মুক্তিযোদ্ধা বলতে আছেন মুকুল ভাই, ডিডু ভাই, সানাউল্লা ভাই। সানা ভাই এখনও ছেলেদের মার্চপাস্ট ও গেরিলা যুদ্ধ শেখাচ্ছেন। এমনিতে আমাদের এ পাড়ায় লোকজন কমে গেছে। লোকজনের মধ্যে আছি আমরা ছাড়াও মহিদুল ভাইদের পরিবার, বিহারী ফরহাদরা, কিরণ এবং কয়েসরা। হিন্দু পরিবারগুলোর মধ্যে আছে উত্তর ও পশ্চিম পাশের এক বুড়ি, বিশু দাদা আর ভানু দাদারা। হারান পালরা চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে। এ ছাড়া পাড়ার মধ্যে বাচ্চু ভাই এবং তেলে মান্নান বলে একজন আছে।
এর মধ্যে বেশ কিছু খবর জানা গেল। শহরের সোনা পট্টিতে এক বিহারী পাহারাদার ছিল। তাকে মুক্তিযোদ্ধারা ২৭ মার্চেই খতম করেছে। তার কাছে অয়্যারলেস ছিল। সে নিয়মিতভাবে পাকিস্তানী মিলিটারিদের তথ্য সরবরাহ করতো। আসলে নাকি সে পাকিস্তানী গোয়েন্দা ছিল।
এ ছাড়া প্রতিদিনই আরও বিপদজনক খবর পাচ্ছি। শোনা যাচ্ছে, পাক বাহিনী পাবনা দখল করার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে জামায়াত আর মুসলিম লীগের সদস্যরা বিহারীদের সঙ্গে করে নানান ষড়যন্ত্র করছে। ওরা পাবনার সব খবর ঢাকায় মিলিটারিদের জানিয়ে দিচ্ছে। লোক দিয়ে এসব খবর পাচার করছে। কাজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সবকিছুই ঢাকার মিলিটারিরা জেনে যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, বিহারী আর জামায়াত-মুসলিম লীগের এইসব লোকেরা বাঙালিদের উপর হামলারও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে নগরবাড়ি থেকে আরও ভয়ংকর খবর পাওয়া গেল। পাকসেনারা নাকি ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে। ওরা পাবনা দখল করে নেবার পর সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, ঈশ্বরদী, রাজশাহী দখলের জন্য এগিয়ে যাবে। খবর পাওয়া গেল, আরিচা ঘাট থেকে পাকসেনারা গানবোট নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বোট থেকে ঘন ঘন গোলা নিক্ষেপ করছে। গত দু’দিন ধরেই এই গোলা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারাও হামলা মোকাবিলায় পাল্টা গুলি ছুঁড়ছে। পাবনা, ঈশ্বরদী এবং সিরাজগঞ্জ থেকে সব মুক্তিযোদ্ধারা এখন নগরবাড়ি ঘাটে সমবেত হয়েছেন। তারা পাক বাহিনীর একটা বড় ধরনের হামলা মোকাবিলার চেষ্টা করছেন।
কয়েকজনের কাছে খবর পাওয়া গেল, পাবনায় পাকিস্তানী মিলিটারিরা বহু অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে গিয়েছিল। কিন্তু তার অধিকাংশই নষ্ট। মিলিটারিরা ‘ফায়ার পিন’ ভেঙে রেখেছিল। তাই টমিগান, চাইনিজ রাইফেল, লাইট মেশিনগান কিংবা হ্যাভী মেশিনগান থেকে ফায়ার করা যাচ্ছে না। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বহু চেষ্টা করেও ওগুলোর ফায়ার পিন মেরামত করতে পারেনি। তাই সব অস্ত্রশস্ত্রই অকেজো হয়ে আছে। আরও জানা গেল, এই অকেজো অস্ত্রের জন্যই হয়তো নগরবাড়ি ঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের পরাজয় ঘটতে পারে।
গোটা পাড়ায় আতংক আবার আকাশচুম্বী হয়ে উঠল। ভয়ে লোকজন বাড়ি ছাড়তে শুরু করল। জামায়াত আর মুসলিম লীগের লোকেরা আরও বেশি ভয় ছড়াতে লাগল।
দিনগুলো যাচ্ছিল খুব অস্থির অবস্থায়। যদিও ভয়ের মাঝেও সাহস জোগানো কিছু ঘটনা ঘটছে। মহিদুল ভাইয়ের ছোট ভাই সেলিম সব আশংকাকে বানচাল করে দিয়ে গলা ছেড়ে গান গায়, ’ও আমার দেশের মাটি, তোমার পড়ে ঠেকাই মাথা’। দারুণ কণ্ঠ। গম গম করে ওঠে চারদিক। নিত্য সাথী ওর এই গানটি। আমাদের পাড়ায় তেলে মান্নান ভাই বলে একজন আছেন, তিনিও একদিন দুপুর বেলা গাইতে গাইতে চলছিলেন, ’আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’ এত দরদ দিয়ে তিনি গাইছিলেন যে চোখে পানি এসে যায়। কিন্তু বুকটা সাহসে ভরে ওঠে। মান্নান ভাই নিজেও আপন মনে বলতে বলতে থাকেন, ’আহ, কত সুন্দর গান। প্রাণ জুড়িয়ে যায়।’ মনে হল, শত কষ্ট আর ভয়ের মাঝে এ গান হল বেঁচে থাকার এখন একমাত্র আশা, একমাত্র ভরসা।
পরিবেশটা হঠাৎ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। পাড়া থেকে মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় ফুরিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনাও নেই। এদিকে পাবনা থেকে নগরবাড়ি পর্যন্ত গোটা সড়ক পথ বড় বড় গাছের গুড়ি, পাথর, ইট ইত্যাদি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সড়কের অনেক জায়গা খুঁড়ে খুঁড়ে বিরাট গর্ত তৈরি করা হয়েছে। শহরের অন্যান্য সংযোগ সড়ক পথগুলোর অবস্থাও একই। কোনও যানবাহন যাতে চলাচল করতে না পারে, তার জন্যই এই ব্যবস্থা। আমাদের পাড়ার মত শহরও জনমানব শূন্য হয়ে পড়েছে।
দিন যাচ্ছে। নগরবাড়ির দিক থেকে ঘন ঘন ভারী বিস্ফোরণের মত ভোতা আওয়াজ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে বিমান হামলাও হচ্ছে। সবাই পরিখায় লুকিয়ে পড়ি। কিন্তু নগরবাড়িতে ঘটছে কি- কিছুই বুঝতে পারিনা। সব যোগাযোগ আরও বন্ধ হয়ে গেছে। পাড়া থেকে সবাই চলে গেলেও আমরা যাইনি। কী করা উচিত বাবা বুঝতে পারছেন না। কোন খবর না পাওয়ায় অবস্থাটা যোগসূত্রহীন গোলার্ধে বসবাস করার মত অবস্থা। (চলবে)




0 মন্তব্যসমূহ