শনিবার, ২ অক্টোবর, ২০২১

রিপোর্টারের টুকরো স্মৃতি- আট

 

রিপোর্টারের

টুকরো

স্মৃতি

 

আবুল হোসেন খোকন .

আট

সাপ্তাহিক বিবৃতিতে আমরা কতগুলো বিশেষ দায়িত্ব পালন করতাম যেমন সম্পাদক শিবজিত দা পত্রিকার সবকিছু দেখাশুনা এবং সম্পাদকীয় লেখা ছাড়াও ছদ্মনামে কলাম লিখতেন 'নির্গুণ ঢুলি নামে লেখা তাঁর কলামটি ছিল তৃণমূলের মানুষসহ উপরের মানুষের কাছে খুবই প্রিয় এবং অকর্ষণীয় বিবৃতির সম্পাদকীয়ও ছিল খুবই সহজ-সরল, সুপাঠ্য, অথচ উচ্চমার্গের পত্রিকার নিউজসহ সবকিছুই ছিল গোছালো, সৃজনশীল যে কারণে সংবাদপত্রের জগতে বিবৃতি ছিল ভাবমূর্তি সম্পণœ একটি ভিন্নধর্মী পত্রিকা জাতীয়ভাবে সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল সাপ্তাহিক একতা, এর পরেই ছিল সাপ্তাহিক বিবৃতি

বিবৃতি পরিবারের সবার মধ্যে ছিল অন্যরকম মেধা, সৃজনশীলতা, একনিষ্ঠতা, ত্যাগের মনোভাব, জনগণমুখিতা, সততা এবং বস্তুনিষ্ঠতা এমন আদর্শিক অবস্থানকে ভিত্তি করেই আমরা যার যার মত লিখতাম এবং কাজ করতাম শুচি সৈয়দ বিবৃতির সাহিত্য পাতা দেখতেন তাঁকে ঢাকা থেকে সহযোগিতা করতেন শ্যামল দত্ত সমজিৎ পাল ছিলেন জনপ্রিয় ছড়াকার তিনিও পাতার দায়িত্ব পালন করতেন তাঁর কারণেই বিবৃতি উপস্থাপন করতো 'ছড়া কার্টুন নামের ব্যতিক্রর্মী ব্যাঙ্গ কার্টুন দেশের মধ্যে এটা ছিল নতুন এবং কার্টুনের ভিন্ন এক ধরণ জাতীয়ভাবে দৈনিক বাংলায় রফিকুন নবীর (রনবী) কার্টুনের পর দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ছড়া কার্টুন কার্টুনে ছবি থাকতো না, তার বদলে থাকতো শুধুই ছড়া যা দিয়ে সারা জাগানো ব্যাঙ্গ তুলে ধরা হতো অবশ্য এক পর্যায়ে ছড়ার সঙ্গে নিজেদের আঁকা কার্টুন ছবিও যুক্ত করা হয় সমজিৎ পাল যখন পড়াশুনার জন্য ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে চলে যান, তখন বাকি সবাই মিলে আমরা ছড়া কার্টুন রচনা বা সংগ্রহ করতাম। বিবৃতি ছিল বহুমুখি প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্র লেখক হিসেবে শিবজিত দা, জাহাঙ্গির আলম মুকুল, মকুল আহমেদ, শ্যামল দত্ত, শুচি সৈয়দ, সমজিৎ পাল, মোস্তাফা আরব সতেজ, অমল কান্তি সরকার এবং অন্যান্যরা একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করতাম আমরা ছিলাম একাধারে সংবাদ লেখক, কবিতা লেখক, গল্প লেখক, সম্পাদকীয় লেখক, উপ-সম্পাদকীয় লেখক, প্রবন্ধ লেখক ইত্যাদি সব সবাই কাজগুলো করতাম একটি সংবাদপত্রে যা কিছু থাকা প্রয়োজন- তার সবই আমরা নিজেরা দিতে সক্ষম হয়ে উঠেছিলাম এমন ঘটনাকে নজীরবিহীন বললে ভুল হবে না। অনেক দু:-কষ্টের মধ্যেও আমাদের কর্মদিনগুলো ছিল আনন্দ এবং উৎসবমূখর প্রায়শই দেশের সেরা সেরা ব্যক্তিত্বদের নিয়ে এসে বণমালী ইনস্টিটিউট, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তন, পাবনা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে করা হতো জমকানো অনুষ্ঠানমালা নানান দিবস পর্বের দিনগুলো উদযাপন করা হতো ব্যাপক ধূমধামের মধ্যদিয়ে করা হতো আনন্দ ভ্রমণ, পিকনিক সব কিছু মিলে পত্রিকার বিস্তৃতি, গ্রহণযোগ্যতা এবং সুনাম এমনই পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, রাজধানীর নামী-দামি ব্যক্তিত্বরা বিবৃতির নাম শোনা মাত্র একবাক্যে ছুটে আসতেন এরকম প্রেক্ষাপট কোন মফঃস্বল শহরের জন্য ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী। একটা পর্যায়ে এসে বিভিন্ন সংস্কৃতিমনা কর্মী, সংগঠক এবং ব্যক্তিত্বদের বড় অড্ডার জায়গা হয়ে ওঠে বিবৃতি আগেই বলেছি, এখান থেকেই জন্ম নেয় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন 'গণশিল্পী সংস্থা এর যিনি প্রধান ছিলেন, সেই জাতীয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পণœ ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী নিজে এসে এই সংগঠনের উদ্বোধন করেন পরবর্তীতে এই গণশিল্পী সংস্থার যাবতীয় কাজকর্মের জায়গা হয়ে ওঠে বিবৃতি এতেকরে বিবৃতির স্বাভাবিক কাজকর্মে কিছুটা ব্যাঘাত শুরু হয় কিন্তু প্রকাশক, সম্পাদক থেকে শুরু করে কারোরই এতে কখনও আপত্তি ছিল না বরং ছিল উৎসাহ আর উৎসাহ ফলে শিল্পীদের যতো রকম মহড়া-প্রশিক্ষণ তার সবই এখানে হতো এমনকি গণশিল্পীর যাবতীয় সাজ-সরঞ্জামও রাখা হতো এখানে এসব ঘটনায় বিবৃতির জনসম্পৃক্ততা ক্রমেই বেড়েছে সব সময় জমজমাট থাকতো অফিস আমাদের গুটিকয় সংবাদকর্মীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান প্রবীণ সাংবাদিক আনোয়ারুল হক, সাংবাদিক রবিউল ইসলাম রবি, সাংবাদিক আবদুল মতীন খান, প্রখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক ডা. ইলিয়াস ইফতেখার রসুল, দন্ত চিকিৎসক ডা. মনোয়ার উল আজীজ, ডা. রাম দুলাল ভৌমিক, আবৃত্তি প্রশিক্ষক সরোয়ার খান মিলন, গণশিল্পীর রাশেদুর রহমান রঞ্জু, অমল সাহা, মোশফেকা জাহান কণিকা, মতিনুল হাসান মতিন, রেজানুর রহমান রোজ, রুচিরা সুলতানা, সাইফুল হক লিটন, শ্যামল দাস, উত্তম দাস, নূর উজ জামান খোকন, উজ্জ্বল সাহা, মির্জা আজাদ, সাব্বির আহমেদ খান লেনিন, নাট্যকার ইজিবর রহমান, অভিনেতা গণেশ দাস, নাজিম উদ্দিন সরদার খোকা, শামীম আহমেদ বাবু, খালেদ হাসান মিলন, ভাস্কর চৌধুরী, শিপ্রা ভৌমিক, বকুল ভৌমিক, বিপ্লব ভৌমিক, নাজমুল হক মণ্টু, সুবহানী বাবু, আবদুল বাতেন আলোক, শাহ আলম সিদ্দিকী খসরু, সাদিক উল হাসনাত জিশানসহ অনেক। সবকিছুরই উত্থান থাকে, পতন বা বিপর্যয়ও থাকে আমাদের ঠিক তেমনটা ছিল না তবে একটা পর্যায়ে শিবজিত দার পক্ষে আর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়নি প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে নানাভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করছিল তাঁকে পাবনা থেকে বদলিও করে দেওযা হয় তিনি চলে গেলে ওই দায়িত্বে আমাকে আসতে হয়েছিল এর আগে শুচি সৈয়দ পাবনা বার্তায় যুক্ত হন সমজিৎ পাল পড়াশুনার জন্য ময়মনসিংহ চলে যান মুকুল আহমেদ নিজস্ব ব্যবসায়িক কাজে মনোযোগী হয়ে ওঠেন মোস্তাফা আর সতেজ ঢাকা চলে যান ফলে কমতে কমতে পুরনোদের অনেকেই নাই হয়ে যান অন্তত পাঁচ বছর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর আমাকেও এখানে নিস্ক্রীয় হয়ে উঠতে হয় কারণ আমি নিজে গণশিল্পী সংস্থার কাজে এতো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে, তখন সম্পাদনার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি গ্রহণ ছাড়া পথ ছিল না । বিশেষ করে তখন সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপট মোটেও সুবিধাজনক ছিল না জান্তা সরকার চারদিকে চক্রান্ত করে সুস্থ পরিবেশ নস্যাৎ করে দেওয়ার চেষ্টা করছিল সারাদেশে দমন-পীড়ন-হত্যা-গুম ইত্যাদি সকল সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিবাদে দেশও ফুঁসে উঠেছিল তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল, সারা দেশের প্রগতিশীল-গণতন্ত্রকামী মানুষ জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে আমাদেরও রুখে দাঁড়ানো উচিত কিন্তু একটি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বে থেকে সরাসরি সেটা করা সম্ভব নয় বাধ্য হয়ে সার্বক্ষণিক সাংবাদিকতার কাজ স্থগিত রাখার কথা ভাবতে হয় এর বদলে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নিয়ে আন্দোলনের ঝাঁপিয়ে পড়াটাই উত্তম মনে হয়েছিল সামরিক সরকার একের পর এক এমন সব ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছিল- যাতে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক এবং সৃষ্টিশীল কাজকর্ম রীতিমত হুমকির মুখে পড়ে যায় এর মোকাবিলা করা এবং লড়াইয়ের জন্য রুখে দাঁড়ানোটাকেই শ্রেষ্ঠ কাজ বলে বিবেচনায় এসেছিল সেই সূত্রেই বিবৃতি ছেড়ে সার্বক্ষণিকভাবে গণশিল্পীর হয়ে কাজে নেমে পড়ি। ঠিক এরকম একটা সময় পাবনার পুরনো সাংবাদিকদের সঙ্গে যুক্ত হন অনেকগুলো নতুন মুখ নতুন বললে সম্ভবত ঠিক হবে না কারণ তাঁদের অনেকেই বেশ আগে থেকে সাংবাদিকতা করে আসছিলেন, কিন্তু সেভাবে দৃর্শপটে আসেননি এই প্রেক্ষাপটে তারা দৃশ্যপটে চলে আসা শুরু করেন সময় পর্যন্ত পুরনো সাংবাদিক ছিলেন (প্রেসক্লাবের তালিকা অনুযায়ী) . আজিজুল হক, . রণেশ মৈত্র, . আনোয়রুল হক, ৪. হাসনাত উজ জামান হীরা, . মির্জা শামসুল ইসলাম, . শফি আহমেদ, . প্রসাদ রায়, . আলী রেজা, . করিম দারা, ১০. রবিউল ইসলাম রবি, ১১. একরামুল হক, ১২. হামিদুল ইসলাম, ১৩. শিবজিত নাগ, ১৪. আবদুল মতীন খান, ১৫. আবদুস সাত্তার বাসু, ১৬. আবদুল আউয়াল খান, ১৭. আবদুল কুদ্দুস চাঁদু, ১৮. আবদুর রশিদ বেনু, ১৯. দুলাল চন্দ্র কুন্ডু, ২০. আবুল হোসেন খোকন, ২১. আমিনুল ইসলাম, ২২. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, ২৩. সুশীল তরফদার, ২৪. মোস্তাফিজুর রহমান চন্দন, ২৫. ইয়াসিন আলী মৃধা রতন, ২৬. ইসমাইল হোসেন শুচি (শুচি সৈয়দ), ২৭. সেরাজুল ইসলাম তোতা, ২৮. মুহম্মদ মহিউদ্দীন এবং ২৯. আমিরুল ইসলাম এই তালিকার সঙ্গে নতুন যুক্ত হলেন ৩০. আবদুল মজিদ দুদু, ৩১. রাশেদুর রহমান রঞ্জু, ৩২. গোলাম কাওসার, ৩৩. মোস্তাফা আরব সতেজ (পুরনো সাংবাদিক, কিন্তু ক্লাবের সদস্য হন পরে), ৩৪. ওয়াহেদ হোসেন, ৩৫. আবদুস সবুর খান হা-মীম, ৩৬. মুরশাদ সুবহানী বাবু, ৩৭. জহরুল হক, ৩৮. শফিউর রহমান খান (পুরনো সাংবাদিক হলেও ক্লাবের সদস্য হন অনেক পরে), ৩৯. বি এম ফজলুর রহমান, ৪০. কা আজিজল হক (তথ্য কর্মকর্তা), ৪১. মাহমুদুল হাসান বাদশা, ৪২. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ এবং ৪৩. আখতারুজ্জামান আকতার

 

---- চলবে-----

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Thanks for Message